নগরীর উপশহর মোড় এলাকায় রাস্তার উত্তরে মহাজোট প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশার আর দক্ষিণে বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনুর নির্বাচনি কার্যালয়। দুইটি কার্যালয়ই নেতা-কর্মী-সমর্থকে সরগরম। মাইকে বাজছে জনপ্রিয় গানের সুরের ওপর নির্বাচনি প্রচারণার কথা বসিয়ে বানানো গান। এ যেন ভোটযুদ্ধ নয়, রীতিমত ভোট উৎসব। এমনই সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যময় পরিবেশ রাজশাহী-০২ (সদর, সিটি করপোরেশন এলাকা) আসনে। বিশেষ কোনও বাধা-বিঘ্ন ছাড়াই বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু ও অন্য দলের প্রার্থীরা সমানতালে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী, নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অভিযোগ, রাজশাহী-২ সদর আসন ছাড়া অন্য পাঁচটি আসনে গ্রেফতার আতঙ্ক রয়েছে বিএনপি প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করা কর্মীরা।
রাজশাহী-১ আসনে (তানোর-গোদাগাড়ী) ধানের শীষের প্রার্থী ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘সরকার দলীয় নৌকার প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরী নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় হবে বুঝতে পেরে নিজে উপস্থিত থেকে দলীয় ক্যাডার ও সন্ত্রাসীদের দিয়ে সমস্ত নির্বাচনি অফিস ভাঙচুর করিয়েছেন ও পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন। একটি পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনও তিনি রাখেননি। সেই সঙ্গে পুলিশকে দিয়ে নেতা-কর্মীদের গণগ্রেফতার করানো হচ্ছে। ধানের শীষের সমর্থক ভোটারদের নিজে মারধর করা অব্যাহত রেখেছেন তিনি। ভোটারদের হুমকিও দিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন অফিস, থানা এবং রিটার্নিং অফিসারের নিকট অভিযোগ দিয়েও কোন লাভ হচ্ছে। সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর তাদের বিতর্কিত করতে সরকার দলীয় ক্যাডাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা বেপরোয়া হয়েছে।’ অতিদ্রুত এই সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে রাজশাহী রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি দাবি জানিয়ে কোনওভাবেই নির্বাচনি মাঠ ছেড়ে না যাওয়ার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু গত কয়েকদিন ধরেই বড় বড় প্রচার মিছিল বের করছেন। গত সোমবার তিনি কুমারপাড়া-আলুপট্টি এলাকায়, মঙ্গলবার সকালে সিএন্ডবি মোড় বিকেলে উপশহর এলাকায় এবং বুধবার সকালে আরডিএ মার্কেট এলাকায় প্রচার মিছিল ও গণসংযোগ করেন। একই সঙ্গে এই আসনটিতে মহাজোট প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশাও প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রচার মিছিলসহ সভাসমাবেশও চলছে।
মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, ‘হাজার হাজার জনসাধারণ ও মা-বোন রাজপথে নেমে এসেছেন। এটা গণঅভ্যুত্থানের মতোই। ধানের শীষের উত্তাল ঢেউ বইছে চারিদিকে। বালির বাধ যেমন নদীতে টেকে না, জনস্রোতের এই ঢেউয়ের কাছে সব কারচুপি, ষড়যন্ত্র বালির বাধের মতোই ভেশে যাবে। সেনাবাহিনী নামার পর মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ধানের শীষের বিজয়ের মধ্যে দিয়ে স্বৈরশসনের পতন হবে এবং গণতন্ত্র মুক্তি পাবে। আমরা বিজয় নিয়েই বাড়ী ফিরব।’ এ বিষয়ে মহাজোট প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘আমরা কোন সহিংসতায় বিশ্বাস করি না। তাই বিএনপির প্রার্থীকে আমাদের পক্ষ থেকে কোনও বাধা দেওয়া হয়নি। তবে বিএনপি-জামায়াত নিশ্চিত পরাজয় জেনে এখন সহিসংতার আশ্রয় নিচ্ছে।’
রাজশাহী-৩ আসনে (পবা-মোহনপুর) ধানের শীষের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন জানিয়েছেন, তার এলাকা এখন সন্ত্রাসের এলাকাতে পরিণত হয়েছে। দিনরাত ধানের শীষের নির্বাচনি অফিস ভাঙচুর করে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। সরকার দলীয় প্রার্থী নিজেই এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
মিলন আরও বলেছেন, তিনি নির্বাচনি প্রচারণায় নামলেই নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তার প্রধান নির্বাচনি এজেন্টকে আটক করে নিয়ে গেছে। জামিনযোগ্য হলেও ষড়যন্ত্র করে তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সরাসরি সরকারি দলের হয়ে কাজ করছে। ভোটার ও নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তারা নির্বাচনকে একতরফা করার জন্য এই কৌশল অবলম্বন করছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি তিনিও আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ ভোটাদের পরামর্শ দেন তিনি।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে বুধবার (২৬ ডিসেম্বর) জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আবু হেনা প্রচারণা চালানি। তবে মঙ্গলবার লাঠি হাতে ধানের শীষের প্রচার চালাতে গিয়ে বহিরাগতসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময় পুলিশ ১৯টি মোটরসাইকেল জব্দ করে। বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাছিম আহমেদ জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃতদের সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দিয়ে আদালতে চালান করা হয়েছে।
রাজশাহী-৫ আসনে (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আইনি জটিলতায় হেভিওয়েট প্রার্থী নাদিম মোস্তফাকে সরে গেলেও টিকে থাকা বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মণ্ডল প্রচারণা তেমন একটা গুছিয়ে উঠতে পারেননি। নিজের দলের দ্বন্দ্বের কারণে কয়েকদিন আগে প্রতীক পাওয়া প্রার্থী নজরুল ইসলাম মণ্ডলের প্রচারণা নৌকার প্রার্থী ডা. মনসুরের প্রচারণার মতো নয়। এরমধ্যে রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী নাদিম মোস্তফার সঙ্গে রেজাউল নামের এক কর্মীর ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ফোনালাপে কোনও এক প্রতিপক্ষকে সরাসরি মারার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কাকে মারতে বলেছেন নাদিম তা বোঝা যায়নি।