ওসমান গণি পেশায় একজন আইনজীবী। মায়ের ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে ৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙতে যে কয়েকজন অকুতোভয় বীর এগিয়েছিলেন তাদের মধ্যে তিনিও একজন। শুধু তাই নয় ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের অগ্রভাগে ছিলেন এই ভাষা সৈনিক।
সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণসহ দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে এই ভাষা সৈনিক রাজশাহী, বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সর্ম্পকে উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করতে কাজ করেছেন।
৮৯ বছর বয়সী এই ভাষা সৈনিক বর্তমানে ভুগছেন বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে। হারিয়েছেন হাঁটা-চলার শক্তি। বেশিরভাগ সময়ই কাটে বিছানায়। ঘর থেকে বের হতে লাগে অন্যের সাহায্য। লোপ পেয়েছে স্মৃতিশক্তিও। অনেকটাই হারিয়েছেন বাকশক্তিও।
‘বাংলা ট্রিবিউনকে’ তিনি বলেন, ‘জীবন সায়াহ্নে এসে কোনও আক্ষেপ নেই। তবে দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার দেখতে চাই।’ বর্তমানে বাংলা ভাষাকে যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তাতেও বেশ ক্ষুব্ধ তিনি। সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহারে সরকারকে আরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ওসমান গণি ‘বাংলা ট্রিবিউন’ জানান, ইতিহাসের ছাত্র তিনি, ছিলেন ঢাবির ফজলুল হক হলের বাসিন্দা। ১৯৫০ সালে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন সাহেবকে আহ্বায়ক করে গঠন করা ‘ভাষা সংগ্রাম’ কমিটির তিনি সদস্য ছিলেন। দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নেতা ও সদস্যদের জেলা ভাগ করে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়। ওসমান গণির দায়িত্বে পড়ে রাজশাহী ও বগুড়া জেলা। সেখানে গিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু শিক্ষক ও কলেজের কমিটির কিছু লোক-‘বাংলাকে’ হিন্দুদের ভাষা, উর্দু মুসলমানদের ভাষা উল্লেখ করে এর বিরোধিতা করেন। পরে সেখান থেকে বগুড়া গিয়ে কলেজে সভা করেন তিনি। সেখানেও ব্যাপক সাড়া পান এবং ঢাকায় ফিরে গিয়ে কমিটিতে রিপোর্ট প্রদান করেন।
তখন ক্ষুব্ধ হয়ে তৎকালীন প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। এর ফলে ঢাকার ছাত্র সমাজ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং ১৪৪ ধারার বিরুদ্ধে স্কুল-কলেজের সকল ছাত্র-ছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হয়। শুধু ছাত্র-ছাত্রী নয়, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও সভা সমাবেশ অব্যাহত রাখা হয়। কেউ আইন ভাঙার পক্ষে, কেউ না ভাঙার পক্ষে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আগত ছাত্রদের নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় সর্বসম্মত সিধান্তে আইন ভাঙার পক্ষে বেআইনি ১৪৪ ধারা মানি না-মানবো না, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি মানতে হবে, স্বৈরাচারী নুরুল আমিনের পতন চাই- স্লোগানে মুখরিত ছাত্ররা এগিয়ে যেতে থাকে। এরপর নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গুলি চলে। পরের ঘটনা সবার জানা।
আন্দোলন দমাতে সংগ্রাম কমিটির নেতাকর্মীদের ধর পাকড় ও হয়রানি শুরু হয়। এ সময় ভাষা সৈনিক ওসমান গণি কালী মন্দির এলাকায় আত্মগোপন করে গোপনে রাজশাহী চলে যান। সেখানে পুলিশ তার উপস্থিতি জানতে পেরে ধরার চেষ্টা করলে তিনি শিবগঞ্জের আদিনায় চলে আসেন। সেখান থেকে নারায়নপুরে, পরে গ্রেফতার এড়াতে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান তিনি। সরকারের সঙ্গে আপস হয়ে হুলিয়া উঠিয়ে নিলে এবং উর্দুর সঙ্গে বাংলাও অন্যতম ভাষা হিসেবে সম্মত হলে ভারত থেকে ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখায় মনোযোগী হন।
পরে ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ; ১৯৫৪-তে এম.এ এবং ১৯৫৬ সালে আইন পাশ করেন। ১৯৫৬ থেকে ৬৪ সাল পর্যন্ত শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে ৬৪ সাল থেকে আইন পেশায় নিয়োজিত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর মো. সুলতানকে আহ্বায়ক করে অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন গঠন করা হলে, সেই অস্থায়ী কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও তিনি কিছু দিনের জন্য দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের অন্যতম সহযোদ্ধাও। মাতৃভাষা আন্দোলনে নিহতদের স্মৃতি ধরে রাখতে শহীদ মিনার নির্মাণের পরিকল্পনার অগ্রভাগেও ছিলেন প্রচার বিমুখ এই ভাষা সৈনিক।
১৯৩০ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্ম নেন ওসমান গণি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়নপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এই ভাষা সৈনিকের পিতার নাম মৃত. আইউব আলী এবং মাতার নাম মৃত. হাজেরা খাতুন। নারায়নপুর থেকে প্রাইমারি ও দাদনচক হেমায়েত হাইস্কুল-মাদ্রাসা থেকে ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। কয়েক মাস ভারতের বর্ধমান মেডিকেল স্কুলে এরপর আদিনা ফজলুল হক কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৫০ সালে হাইয়ার এডুকেশন পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নানাভাবেই অবদান রাখা, প্রচার বিমুখ এই ভাষা সৈনিক আজও পাননি তার যথাযথ মর্যাদা। খুব একটা পরিচিত নন নতুন প্রজন্মের কাছেও।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফায়জার রহমান মানি জানান, জেলার এই কৃতি সন্তান ভাষা আন্দোলন চলাকালীন উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যেভাবে ছাত্র সমাজকে সংগঠিত করেছিলেন; সেটা বর্তমান প্রজন্ম জানে না। যাদেরকে তিনি ভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন; অথচ এখনও তিনি উপেক্ষিত থেকে গেছেন। আজ পর্যন্ত তাকে দেওয়া হয়নি কোনও সম্মাননা।
তিনি আরও বলেন, সম্মাননার ক্ষেত্রে আমরা দেখি যারা যেকোনও বিষয়ে অবদান রাখেন, কিন্তু মফস্বলে থাকেন বা চলে আসেন, তাদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি একটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে তাদেরকে সম্মান জানানো হয় না। এই ভাষা সৈনিককে সম্মাননা দেওয়া হলে সারা দেশের মানুষ জানতে পারবে কতদুর পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের পরিধি ছড়িয়ে পড়েছিল। ভাষা আন্দোলনের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভাষা সৈনিক ওসমান গণিকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু (একুশে পদক) দেওয়া হোক।
নাট্য ব্যক্তিত্ব ‘থিয়েটার’ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান প্রামাণিক জানান, ‘প্রচার বিমুখ এই মানুষটি আজও উপেক্ষিত। এ লজ্জা আমরা রাখবো কোথায়? জেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরাও তাঁকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেননি।’
ভাষা সৈনিকের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন জেলার সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখার সভাপতি অ্যাডভোটে সাইফুল ইসলাম রেজা বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের সময় ভাষা সৈনিক প্রয়াত আব্দুল মতিনের সঙ্গে সহযোদ্ধার ভূমিকায় ছিলেন ওসমান গণি। কিন্তু এই ভাষা সৈনিক মফস্বলে বাস করায় এখনও তাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। তার উপযুক্ত প্রাপ্তি, উপযুক্ত অধিকার, উপযুক্ত স্বীকৃতি এখন পর্যন্ত তাকে দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয় এই ভাষা সৈনিক ৭১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যুদ্ধের সূচনা লগ্নে সিপাহশালার ভূমিকা পালন করেছেন। বহু সামাজিক সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ও লোক সংস্কৃতির গবেষক প্রফেসর ড. মাজহারুল ইসলাম তরু জানান, ‘মহান ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর অতিবাহিত হলেও; দুঃখজনক সত্য যে যারা ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের কোনও তালিকা বাংলাদেশে প্রস্তুত হয়নি। এ বিষয়ে ২০১০ সালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে রিট করা হয়। সেই বেঞ্চে বলা হয়েছিল যারা ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের একটি তালিকা তৈরি করা হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা তৈরি হয়নি।’