আম বাগানে পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ, চাষি ও ব্যবসায়ীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

01আমে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রতিরোধে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ রাজশাহী অঞ্চলের আম বাগানগুলোতে পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। এই রায়কে জনগণ স্বাগত জানালেও; মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে জেলার আম চাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের মাঝে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগানগুলোতে এখন আমের গুটি অবস্থা। আর মাস দুয়েক পরেই এসব আম উঠবে বাজারে। আমের ভালো ফলন পেতে এবং রোগবালাই দমনে কৃষকরা নিচ্ছেন বাড়তি পরিচর্যাও। তবে উচ্চ আদালতের এই আদেশ নিয়ে জেলার আম চাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের মাঝে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
তারা বলছেন, কীভাবে এই আদেশ বাস্তবায়িত হবে; আম উৎপাদনে কী পরিমাণ বালাই নাশক প্রয়োগ করা যাবে; আমের কোন অবস্থা থেকে এ আদেশ বাস্তবায়িত হবে এসব বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন তারা। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন পুলিশি হয়রানিরও।
জেলা সদরের আম চাষি জাফরুল আলম বলেন, জেলার প্রায় ৭০/৮০ ভাগ জায়গা জুড়েই রয়েছে আমের বাগান। এ অবস্থায় এতো আমবাগানে কি পুলিশ নিয়োগ দেওয়া সম্ভব? হঠাৎ করে পুলিশের আগমন যাতে চাষিদের আতঙ্কিত না করে, মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চার না করে এ বিষয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, আম গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও আম উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সবাইকে নিয়ে বসে একটি সুষ্ঠু সমাধানের পথ বের করতে হবে; তাহলে আদালতের এই আদেশ জনস্বার্থে সুফল বয়ে আনবে।02
শিবগঞ্জের আম চাষি ও বাগান মালিক আব্দুল মজিদ বলেন, এখন আমের গুটি অবস্থা। এ অবস্থায় আমের নানা ধরনের রোগবালাই দেখা দেয়। বিশেষ করে আমের মহা (এক ধরনের আঠা জাতীয় ছত্রাক) বিভিন্ন পোকার আক্রমণ, ঝরে পড়া ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেয়। আর এ সময় কৃষি বিভাগ ও ফল গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী চাষিরা কীটনাশক (বালাই নাশক ও ছত্রাক নাশক স্প্রে করেন) প্রয়োগ করেন। আর স্প্রে করার সময় পুলিশ বাধা দিলেতো বাগানে আম উৎপাদন করাই সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে আমরা কী করবো? এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না পেলে আমরা আম চাষিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো।
আম বাজারজাত ও গুদামজাতকরণের সময় কেউ যাতে আমে ক্ষতিকর রাসায়নিক পর্দাথ প্রয়োগ করতে না পারে এ বিষয়কে স্বাগত জানায় চাষিরা।ও এক্ষেত্রে আমরা উচ্চ আদালতের নির্দেশিত পর্যবেক্ষণ টিমকে সহায়তা করতেও প্রস্তুত তারা।
বাংলাদেশ ম্যাংগো প্রডিউসার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মনোয়ারুল ইসলাম ডালিম বলেন, ‘আমের ক্ষতিকর পোকা ও রোগবালাই দমনে এবং আম বাজারজাত পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষি বিভাগ ও ফল গবেষকদের পরামর্শেই কৃষকরা বিভিন্ন বালাই নাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেন। এ অবস্থায় আম বাগানে পুলিশ মোতায়নে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ অঞ্চলের আম চাষিরা।’
ব্যবসায়ী নেতারা আরও জানান, ‘বাগানে পুলিশ মোতায়েনে হয়রানিরোধে প্রয়োজন প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের। যাতে সম্পৃক্ত থাকবে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, আম চাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊবর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জমির উদ্দিন জানান,‘ আম শিল্পকে বাঁচাতে উচ্চ আদালতের এই আদেশ বাস্তবায়নে কোনও পক্ষই যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখবেন আদালতের নিদের্শিত পর্যবেক্ষণ টিম। এছাড়া কৃষকদের আতঙ্কিত না হয়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী আম ও বাগানের পরিচর্যা করতে হবে।’
এদিকে গত ৯ এপ্রিল উচ্চ আদালত সাত দিনের মধ্যে বাগানে পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত বাগানে কোনও পুলিশ মোতায়েন করা হয়নি।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ সুপার টিএম মোজাহিদুল ইসলাম বলেন,‘উচ্চ আদালতের লিখিত কোনও আদেশের কপি এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে পৌঁছায়নি। আদেশের কপি পৌঁছালে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য,গত ৯ এপ্রিল উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ আগামী সাত দিনের মধ্যে আমে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যাবহার রোধে বাগানগুলোতে পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ দেয় রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজিকে এবং তা বাস্তবায়নের পর পুলিশের আইজি, র‌্যাবের মহাপরিচালক, বিএসটিআইয়ের চেয়ারম্যানকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।