উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকালে লিটন মণ্ডল তার দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া ফুলতলা এলাকায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে দুর্ঘটনার শিকার হন। একটি ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে গুরুতর আহত হন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লিটন মণ্ডল (৪২) বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ঘোষপাড়ার নবীর উদ্দিনের ছেলে। তিনি স্থানীয় সকাল বাজারে চা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। জমিজমা না থাকায় অভাব অনটনের মধ্যে সংসার চলে। এ কারণে তিনি তার বড় ছেলে আসিফ মণ্ডলকে (১৩) শিবগঞ্জের মোকামতলায় শ্বশুর বাড়িতে রেখেছেন। আসিফ গত জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। এখন সেখানে একটি বেসরকারি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবারের ইচ্ছা ছিল মেধাবি আসিফকে শহরের ভালো কোনও স্কুলে ভর্তি করবেন। মেয়ে লামিয়া জাহান (৭) শেরপুরের লিটল স্টার কেজি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল বন্ধ থাকায় কয়েকদিন আগে নানা এসে লামিয়াকে নিয়ে যান। এ অবস্থায় লিটন মণ্ডল তার ছেলে ও মেয়েকে নিতে শ্বশুর বাড়ি যান।
বৃহস্পতিবার সকালে লিটন তাদের নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ির দিকে রওনা হন। ছেলেমেয়ে আসার খবরে মা ফারজানা পছন্দের খাবার রান্না করে তাদের পথ চেয়ে অপেক্ষা করছিলেন। সকাল পৌণে ৯টার দিকে মোটরসাইকেল বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া ফুলতলা এলাকায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে পৌঁছায়। এ সময় বিপরীত দিক থেকে বেপরোয়া গতিতে আসা টিসিবির ব্যানার লাগানো একটি মিনিট্রাকের চালক মঞ্জুরুল আলম অপর একটি ট্রাককে অতিক্রম করার চেষ্টা করেন। তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেন। এতে লিটন মণ্ডল, ছেলে আসিফ মণ্ডল ও মেয়ে লামিয়া জাহানের ডান পা থেতলে যায়। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ভর্তি করেন।
শজিমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আবদুল ওয়াদুদ জানান, লিটন ও লামিয়ার ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়েছে। আসিফের পা রক্ষার চেষ্টা চলছে; সম্ভব না হলে সেটিও কেটে ফেলতে হবে।
শুক্রবার (৮ মে) বিকালে ফোনে কান্নায় ভেঙেপড়া ফারজানা খাতুন জানান, সংসারে অভাব থাকলেও সুখের কমতি ছিল না। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা তার জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। স্বামী ও ছেলেমেয়েকে আজ পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, 'আমার মেয়ের কী হবে? কীভাবে ওর জীবন চলবে? পঙ্গু মেয়েকে কেউ বিয়ে করতে চাইবে না।' ফারজানা তার পরিবারকে বাঁচাতে স্বামী ও ছেলেমেয়ের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন।
লিটনের বন্ধু হাফিজুর রহমান জানান, তিন জনের জ্ঞান ফিরেছে। তারা কান্নাকাটি করছেন। ভবিষ্যতের কথা ভেবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া লিটন ও তার স্ত্রী ফারজানা প্রচণ্ড অসহায় বোধ করছেন। তাদের আহাজারিতে আশপাশের রোগীর স্বজনরাও কেঁদে ফেলছেন।
তিনি আরও জানান, শুক্রবার কোনও চিকিৎসক দেখতে আসেননি। আসিফের পা থাকবে কী থাকবে না, সে ব্যাপারে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।
হাইওয়ে পুলিশ কুন্দারহাট ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনার পরপরই চালক মঞ্জুরুল আলমকে ট্রাকসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে বগুড়া জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।