বগুড়া জেলা মোটর মালিক গ্রুপের কর্তৃত্ব দখল নিয়ে ক্ষমতাসীনদের দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। একপক্ষে রয়েছেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম এবং অপর পক্ষে সাবেক আহ্বায়ক মঞ্জুরুল আলম মোহন। মঙ্গলবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে প্রতিপক্ষ গ্রুপ শহরের চারমাথা এলাকায় আমিনুল গ্রুপের ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। আমিনুলের অফিস ভাঙচুরের পর অগ্নিসংযোগ এবং তিন-চারটি বাস ভাঙচুর, পরিবহন মালিকদের বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সময় দু’পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। হামলায় পুলিশসহ অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও শর্টগানের গুলি ছুড়েছে।
আমিনুল ইসলাম দাবি করেছেন, মঞ্জুরুল আলম মোহন বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে পুলিশের ছত্রচ্ছায়ায় এ হামলা চালায়। সশস্ত্র ক্যাডাররা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ভাঙচুর, তার অফিসে অগ্নিসংযোগ, বাস, মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও আগুন দেয়। তিনি মোহনকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত বগুড়ায় পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে পুরো উত্তরাঞ্চলে এ কর্মসূচি দেওয়া হবে।
মোহন বলেন, ‘আমি পরিবহন মালিক হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন, কিন্তু এ হামলার সঙ্গে জড়িত নই। তারা নিজেরা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করে আমাদের দায়ী করছেন।’
জানা গেছে, লাভজনক প্রতিষ্ঠান বগুড়া জেলা মোটর মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারদলীয় কিছু নেতার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। একপক্ষে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন ও অপরপক্ষে যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম। এ বিরোধের কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেন। তবে হাইকোর্ট ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশ রয়েছে এমনটা দাবি করে আমিনুল ইসলাম কর্তৃত্ব দখলে রাখেন। তিনি নির্বাচনের বিরোধিতা করে মোটর মালিক গ্রুপের অফিস ও মালামাল নিজ হেফাজতে চারমাথা এলাকায় রেখেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীলা জানান, মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক আহ্বায়ক ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহনের নেতৃত্বে শতাধিক মোটরসাইকেলে ক্ষমতাসীন দলের যুব ও ছাত্র সংগঠনের বিপুল সংখ্যক ক্যাডার শহরের চারমাথা এলাকায় আমিনুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণে থাকা মোটর মালিক গ্রুপের অফিস দখলের প্রস্তুতি নেন। খবর পেয়ে যুবলীগ নেতা আমিনুলের লোকজন এগিয়ে আসতে থাকেন। তারা মোহন গ্রুপকে প্রতিহত করার জন্য শ্রমিকদের প্রস্তুতি নিতে বলে। খবর পেয়ে সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ, সদর থানার ওসি হুমায়ুন কবিরে নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক পুলিশ চারমাথা এলাকায় অবস্থান নেয়।
এ সময় আমিনুল গ্রুপের লোকজন লাঠিমিছিল শুরু করেন। মোহন গ্রুপ বিপুল সংখ্যক ক্যাডার নিয়ে সান্তাহার সড়কে অবস্থান নেন। মোহন গ্রুপ লাঠিসোঁটা নিয়ে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে আমিনুল গ্রুপের ওপর হামলা চালায়। আমিনুল গ্রুপের লোকজনকে পুলিশ ধাওয়া করে তাড়িয়ে দিলে মোহন গ্রুপের লোকজন চারমাথা টার্মিনাল এলাকায় ব্যাপক ভাঙচুর শুরু করেন। তারা চারমাথা এলাকায় আমিনুলের পৌর কাউন্সিলর কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এছাড়া সেখানে থাকা অন্তত ১০টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও পাঁচটিতে আগুন দেন। এছাড়া চারমাথার আশপাশে থাকা আমিনুলের মালিকানাধীন শাহ্ ফতেহ আলী পরিবহনের চার-পাঁচটি বাস ভাঙচুর করেন। ঘণ্টাব্যাপী এ তাণ্ডবের সময় ছুরিকাঘাতে পুলিশের বিশেষ শাখার কনস্টেবল রমজান আলী ও আমিনুল গ্রুপের অন্তত ২৪ জন আহত হন। এ সময় ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ও আশপাশের অন্তঃজেলা রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও শর্টগান দিয়ে রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে মোহন গ্রুপের লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এরপর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় পুলিশ অন্তত নয় জনকে আটক করে। আমিনুল গ্রুপ চারমাথা এলাকায় আসার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ফিরিয়ে দেয়। সেখানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক, পৌর কাউন্সিলর যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম এ হামলার প্রতিবাদে বগুড়া জেলায় পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেন। তিনি এ হামলার জন্য আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল আলম মোহনকে দায়ী করে তাকে গ্রেফতারের দাবি জানান। মোহনকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। পরে রাজশাহী বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে পুরো উত্তরাঞ্চলে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হবে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হবে।
মঞ্জুরুল আলম মোহন বলেছেন, তারা কোনও হামলা করেননি। পুলিশের উপস্থিতিতে আমিনুল গ্রুপের লোকজন তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ সময় তার তিনটি বাস ও তেলপাম্পে হামলা করা হয়েছে।
বগুড়া সদর থানার ওসি হুমায়ুন কবির জানান, মোহন গ্রুপ প্রথমে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মারপিট করেছে। ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত তাদের এক কনস্টেবলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শর্টগান দিয়ে ২০-২২ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়েছে।
বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ ফয়সাল মাহমুদ জানান, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। বিকাল পর্যন্ত নয় জনকে আটক করা হয়েছে।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আবদুল ওয়াদুদ জানান, শর্টগানের গুলিবিদ্ধ দুজনসহ আহত সাত জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত।