রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করা সেই নার্সকে বদলি করেছে কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (১৮ মার্চ) নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সিদ্দিকা আক্তার স্বাক্ষরিত এক বদলির আদেশে জানানো হয় ওই নার্সকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযুক্ত ডাক্তারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিপরীতে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভুক্তভোগী ও তার সহযোগীদের হয়রানি করার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের রামেক হাসপাতাল শাখার নেতৃবৃন্দ।
তারা বলছেন, এমন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যৌন হয়রানিকে আরও উৎসাহিত করছে কর্তৃপক্ষ। সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার না করে অভিযুক্ত ওই ডাক্তারের পক্ষ নিয়েছে তারা। এমন ঘটনা চলতে থাকলে আগামীতে প্রতিবাদ করতেও ভয় পাবে ভুক্তভোগীরা। তাই এমন ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সে জন্য কর্তৃপক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা। এসময় যৌন হয়রানির ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে সংবিধান অনুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করে সুষ্ঠু তদন্ত, ভুক্তভোগী নার্সের বদলি প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে হয়রানি করা স্থানীয় প্রশাসনের অপসারণের দাবি জানান তারা।
বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের রামেক হাসপাতাল শাখার সভাপতি শাহাদাতুন নূর লাকি জানান, ভুক্তভোগী এই নার্সকে গত ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) যৌন হয়রানি করে চিকিৎসক মামুন-অর-রহমান। বিষয়টি গণমধ্যমে আসলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই কমিটি সাংবিধানিক নিয়মকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে তৈরি করা হয়। প্রথম থেকেই এ কমিটির থেকে সুষ্ঠু তদন্ত সম্ভব নয় বলে তারা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনও কর্ণপাত করেনি। বরাবরই সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন রামেক পরিচালক। কিন্তু এর উল্টো চিত্র দৃশ্যমান হয়েছে।
শাহাদাতুন নূর লাকি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা জানতে পেরেছি তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে অনেক আগে। কিন্তু সেই প্রতিবেদন আমরা চেয়েও পাইনি। এছাড়াও অভিযুক্ত চিকিৎসককে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে বলা হলেও, কোনও ডকুমেন্ট উপস্থাপন করেনি কর্তৃপক্ষ। এ কারণে উপায়ান্তর না দেখে আগামী রবিবার আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছিলো ভুক্তভোগী। এরইমধ্যে ভুক্তভোগী নার্সকে অভিযুক্ত চিকিৎসকের জেলায় অবস্থিত চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে। যা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ঘটনা।
এরআগে ঘটনাটিকে ছোট্ট ঘটনা অ্যাখ্যা দিয়ে আপোস-মীমাংসার জন্য বলা হয়। কিন্তু শাস্তি চাওয়ায় ভুক্তভোগীসহ নার্স সংগঠনকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হয়রানির করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন শাহাদাতুন নূর লাকি দাবি করেন নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের রামেক হাসপাতাল শাখার সভাপতি।
ভুক্তভোগী নার্স ১৩ মে ২০২০ রামেক হাসপাতালে নার্স হিসেবে যোগদান করেন। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের এ বদলি আদেশে যৌন হয়রানির শিকার এ নার্স ও রামেক হাসপাতালের আরও দুই জনসহ মোট সাত জনকে চট্টগাম, সিলেট, কক্সবাজার ও লক্ষ্মীপুরে বদলি করা হয়েছে। বদলি আদেশে বলা হয়েছে ২৪ মার্চের মধ্যে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। অন্যথায় ২৫ মার্চের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রধান রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের (রামেক) উপাধ্যক্ষ ডা. হাবিবুল্লা সরকার বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে প্রধান করে কমিটি করে দিয়েছে। এটা সাংবিধানিক নিয়মে করা হয়েছে, নাকি সংবিধান বহির্ভূতভাবে করা হয়েছে এটা কর্তৃপক্ষ জানে। এছাড়া নিয়মানুযায়ী প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছি। এ বিষয়ে কোনও কথা বলতে পারবো না।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, এ ঘটনার পর বিষয়টি প্রথমে মেডিক্যাল প্রশাসনকে না জানিয়ে ভুক্তভোগী নার্স তার অ্যাসোসিয়েশনকে জানিয়েছেন। নার্স অ্যাসোসিয়েশন তাকে আমার কাছে নিয়ে আসে। যাই হোক, এরপর এ ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। তারা সেইভাবে বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেনি। তবে অভিযুক্ত ডাক্তার আমার সামনে ঘটনার সত্যতা শিকার করেছিল। এরপর তাকে উইথড্রো করেছি।
তদন্ত কমিটি সংবিধান মেনে করা হয়েছে কিনা? এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ঘটনার পর তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় তিনি নিয়মটা জানতেন না।
ভুক্তভোগী নার্সের বদলির পেছনে রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনও ভূমিকা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আজ এখানে আছে, কাল অন্য জায়গায় থাকবে, এটাই নিয়ম। আর যারা আন্দোলন করছে এ বিষয়গুলো ডিজি নার্স দেখাশোনা করেন। কিছুদিন আগে তাদের একজনকে বদলি করা হয়েছিল। যেটা পরবর্তীতে বাতিল করা হয়েছে।
আন্দোলন করলেই বদলি করে দেবে, এটা ডিজি নার্স বলে দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্ত চলাকালে আন্দোলন করলে বদলি করে দেওয়া হবে এটা নার্স ডিজি বলেছেন। এখানে আমাদের কোনও হাত নেই। আর আমরা বদলি করাই না। এটা ডিজি হেলথ করে থাকে। এছাড়া এ ঘটনায় ভুক্তভোগী যদি চায় তবে পুনরায় কমিটি গঠন করে তদন্ত করা যায়।
ভুক্তভোগী নার্স বলেন, এমন একটি ঘটনার প্রতিবাদ করা একজন নারীর পক্ষে অনেক কঠিন। প্রতিবাদ করায় এখন প্রতিনিয়ত আমাকে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিলেও তা হয়নি। বরং উল্টো হয়রানির শিকার হয়েছি। নিয়ম বহির্ভূতভাবে গঠিত তদন্ত কমিটি থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত কখনও আশা করিনি। কিন্তু এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের দোষ শিকার করলেও, নাকি তারা প্রমাণ পাননি! এটি একজন ভুক্তভোগী নারীর জন্যে কতটা কষ্টকর তা বলে বোঝানো যায় না।
তবে তিনি থামছেন না। ন্যায় বিচারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন ও আইনের আশ্রয় নেবেন বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, এ ঘটনায় অভিযুক্ত চিকিৎসকের নাম মামুন-অর-রহমান। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যানেসথেসিয়ার ওপর কোর্স করছিলেন এবং কোর্সের অংশ হিসেবে রামেক হাসপাতালে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ডা. মামুন চট্টগ্রামের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি করছেন। ছুটি নিয়ে তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অ্যানেসথেসিয়া কোর্স করছিলেন। রামেকে অস্থায়ী অব্যাহতির আগ পর্যন্ত তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) প্রশিক্ষণের কাজ করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে সেখানেই তিনি যৌন হয়রানির ঘটনাটি ঘটিয়েছেন গত ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি। পরদিন তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে রামেক হাসপাতালের প্রশিক্ষণ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এছাড়া অ্যানসথেসিয়ার কোর্স থেকেও তাকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে সুপারিশ করা হয়েছিল।