‘ইমোশন টু জেনারেট চেঞ্জ’ শিরোনামে ১০ দিনব্যাপী ইতালির রোমের সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে হয়ে গেলো বাংলাদেশের আলোকচিত্রী আসাফ উদ দৌলার ৪০টি ছবির একক প্রদর্শনী।
গত ৩১ অক্টোবর শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীর কিউরেটর ছিলেন ইতালির বিখ্যাত চিত্র পরিচালক ও লেখক লিয়া বেলত্রামি। আসাফের অনুপস্থিতিতেই তিনি প্রদর্শনীর সব কাজ সারেন। তবে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন আসাফ। পোপ নিজে এসে উদ্বোধন করেন প্রদর্শনীটি।
পরে ১৬-২৫ নভেম্বর একটি একক প্রদর্শনী করেন ইতালির রোমের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতালির মাটিতে আসাফের ৩য় একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ছিল ওটা।
এর আগে ২০১৮ সালে রিলিজিয়ন ট্যুডে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আয়োজনে ৩৩টি ছবি নিয়ে ইতালির ত্রেন্তো শহরে করেন ১ম একক প্রদর্শনী। সে বছর তিনি ওই উৎসবে সেরা আলোকচিত্রীর সুনাম অর্জন করেন। পরে ২০২০ সালে আগোরা ‘ওয়ার্ল্ড বেস্ট ফটো’ গ্রিন হিরো-২০২০ অ্যাওয়ার্ডও পান।
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর এলাকার শান্তা মহল্লার সামছুল আজমের ছেলে আসাফ উদ দৌলা। বিএসসি ইন সিভিল ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করে এখন রুরাল ডেভেলপমেন্ট একাডেমিতে আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করছেন বগুড়ায়।
আলোকচিত্রী আসাফ উদ দৌলা বলেন, সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে বিশাল আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। আর সেটা কিনা আমার! ভাবলেই বুক গর্বে ভরে যায়। আমার মতো অতি সামান্য একজন মানুষের ছবি দেখার জন্য এত ভীড়! আমার প্রিয় সুজলা-সুফলা মাতৃভূমির জলবায়ু পরিবর্তনসহ মাটি ও মানুষের হাস্যোজ্জ্বল ৪০টি জীবনের ছবি আছে সেখানে। ছবিগুলো দেখে সবাই বাংলাদেশকে চিনছে।
২০০৮ সালে মামার উপহার দেওয়া ১.৩ মেগা পিক্সেলের একটি মোবাইল ফোন হাতে পান আসাফ। ওটা দিয়েই ছবি তোলা শুরু। ২০১২ সালে প্রথম সেমি এসএলআর ক্যামেরা হাতে পান। অনলাইনে পড়াশোনা, ওয়ার্কশপ ও সিনিয়র আলোকচিত্রীদের সঙ্গে থেকে শিখেছেন বাকিটা।
পরে ২০১৪ সাল থেকে শুরু করেন প্রদর্শনী। প্রতিযোগিতাতেও অংশ নিতে থাকেন। একে একে পেয়েছেন নানা অ্যাওয়ার্ড। ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত মিলান এক্সপো ২০১৫’তে তার ৮টি ছবি ৬ মাস ধরে প্রদর্শিত হয়।
পরে কাজাকস্তান এক্সপো ২০১৭’তেও অংশ নেন আসাফ। সেখানেও একমাত্র এশিয়ান হিসেবে তার ছবির প্রদর্শনী চলে তিনমাস। এ ছাড়াও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন, জিও এশিয়া-স্পেন ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন নামকরা ম্যাগাজিনে তার ছবি ও ফিচার প্রকাশ হয়েছে।
২০১৮ সালে আসাফ বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ইতালির ত্রেন্তো শহরে যান রিলিজিওন টুডে ফিল্ম ফেস্টিভালে যোগ দিতে। সেখানে ১২ দিন ধরে তার ৩৩টি ছবি দেখানো হয়। ‘স্পিরিট অফ ফেইথ’ নামের ওই একক প্রদর্শনী চলাকালে ফটোগ্রাফি ও ফিল্ম মেকিং নিয়ে ১০ দিনের একটি ওয়ার্কশপও করেন সেখানে। সেখানেও ফটোগ্রাফার অফ দি ইয়ার ২০১৮ পুরস্কার পান আসাফ।
২০১৯ সালে ফের লাল-সবুজের হয়ে যোগ দেন নেপালের সপ্তম হিউম্যান রাইটস ফিল্ম ফেস্টিভালে। ২০২০ সালের শুরুতে ভারতের অরুণাচলে বাটারফ্লাই ফেস্টিভালেও তার একটি একক প্রদর্শনী করেন।
একাধিকবার আমন্ত্রিত হয়েছেন বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে মেন্টর, স্পিকার হিসেবে। বিচারক হিসেবেও কাজ করছেন দেশ বিদেশের বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার।
২০১৪ সালে আসাফ প্রতিষ্ঠা করেন ‘জয়পুরহাট ফটোগ্রাফিক গ্রুপ’। জয়পুরহাটের বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে এনেছেন তরুণ মেধাবীদের। ঈদের সময় তাদের সঙ্গে বড় ওয়ার্কশপ ও ফিল্ড ওয়ার্ক করেন।
তার সবশেষ ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছিল জয়পুরহাট পৌরসভার ১২০ জনেরও বেশি আলোকচিত্রী। এ ছাড়া তিনি জয়পুরহাটের প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মানের একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তিনি। সেখানে জেলার প্রবীণ আলোকচিত্রিকে সন্মাননাও দেন।
আসাফ উদ দৌলার বাবা সামছুল আজম বলেন, আমিও এক সময় ছবি তুলতাম। সে সময় ছেলে ক্যামেরা নাড়াচাড়া করতো। ছবি দেখে দেখে সে প্রলুব্ধ হয়। এরপর শখ থেকে ছবি তোলার নেশা হয়ে যায়। বকুনিও দিয়েছি অনেক। পরে তার মামা একটি ক্যামেরা-মোবাইল কিনে দেয়। সেটা দিয়ে ছবি তুলতে তুলতে টিফিনের জমানো টাকা দিয়ে একটি ক্যামেরাও কেনে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুজন সেন বলেন, ফটোগ্রাফি শিল্পে বাংলাদেশে যে ধারা অব্যাহত রয়েছে, আমরা তা নিয়ে আশাবাদী। আমরা আশা করছি তার এই ছবিগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি উন্নত অবস্থায় যাবে।