রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ে চলনবিল। অর্ধবঙ্গেশ্বরী রাণী ভবানী ছাড়াও এই অঞ্চলে এক সময় রাজত্ব ছিল অনেক রাজার। তাদের সেইসব সোনালী অতীতের সঙ্গে প্রাচীন বাংলার বেশ কয়েক ঝলক দেখা যাবে চলনবিল জাদুঘরে। অথচ জাদুঘরটিতে যে পরিমাণ দর্শনার্থীর ভিড় থাকার কথা তা হয় না। মাত্র একজনের তত্ত্বাবধানে জাদুঘরটি দেখতে হয় বলে ফিরে যেতে হয় অনেককে। মাঝে মাঝে সেই একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ দর্শনার্থীদের।
রাজশাহীর পুঠিয়ার রাজ-রাজন্যের বসবাস। এগুলোকে ঘিরেই চলনবিলে হয়েছিল রাজা, মহারাজা, জমিদারদের আবাস। এ কারণে এ অঞ্চলে আছে নানা প্রাচীন নিদর্শন, রাজা-মহারাজাদের ব্যবহৃত নানা সামগ্রী। মূল্যবান এ সামগ্রীগুলো আগামী প্রজন্মের কাছে অক্ষত অবস্থায় পৌঁছে দিতেই কিছু সচেতন সমাজকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে চলনবিলের শিক্ষাবিদ, লেখক ও সমাজ সংস্কারক এম এ হামিদ অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তোলেন জাদুঘরটি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর নাটোর জেলার গুরুদাসপুর থানার খুবজীপুর গ্রামে অস্থায়ীভাবে চলনবিল জাদুঘর যাত্রা শুরু করে।
পর্যায়ক্রমে এতে স্থান পায় হাতে লেখা ধর্মগ্রন্থ, ভবানীর দলিল, দুর্লভ পুরাকীর্তি, মূর্তি, বিভিন্ন শাসনামলের মুদ্রা, পুরনো তুলট কাগজে লেখা তিন-চারশ’ বছরের পুরনো প্রায় আড়াইশ ধর্মগ্রন্থ, টেরাকোটা, কষ্টি পাথরের সূর্যদেব, বিষ্ণু ও মাতৃকা মূর্তি প্রভৃতি।
১৯৮৯ সালের ২ জুলাই প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আওতাভুক্ত হয় চলনবিল জাদুঘর। ১৯৯৪ সালে এটি সরকারিকরণ করা হয়। মূলত গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের চত্বরেই দোতলা ভবনের নিচতলায় জাদুঘরটির অবস্থান। জাদুঘর চত্বরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে পুরনো একটি ভবন। দুর্লভ নিদর্শনগুলোর অনেক কিছুই এখন নেই। তাই লোক সমাগমও কম।
স্থানীয়রা জানালেন, চলনবিলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা হলেও মূলত সরকারিকরণের পর পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি জাদুঘরটি। ফলে ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি নিদর্শনগুলোর। অযত্নে এরইমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে অনেক কিছু।
জাদুঘরটি দেখভাল করছেন আবু বক্কর নামের একজন কর্মচারী। তাকে দিয়েই কয়েক বছর ধরে চলছে জাদুঘরের কার্যক্রম। আবু ব্ক্কর জানালেন, ২০০২ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। এর আগে বেশ কয়েকজন দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে এবং রাসায়নিক পরিচর্যার জন্য জাদুঘরে রক্ষিত কিছু দুর্লভ মূর্তিসহ ৯০টি দেশের প্রাচীন মুদ্রা ও বেশ কিছু মূল্যবান নিদর্শন বগুড়ায় নেওয়া হয়। সেগুলো এখনও ফেরত দেওয়া হয়নি। এখন আছে ১০৪টি সামগ্রী। ভবনের নিচতলার দুটি রুমে রাখা হয়েছে সেগুলো।
প্রবেশপথেই রয়েছে চলনবিলের কৃতি সন্তান স্যার যদুনাথ সরকারের পোড়ামাটির একটি মূর্তি। রয়েছে গাছের বাকলে লেখা প্রাচীন পুঁথির পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন সময়ের স্বর্ণ, রুপা ও তামার মুদ্রা।
সুলতান নাসির উদ্দিনের নিজ হাতে লেখা পবিত্র কুরআন শরীফ থেকে শুরু করে আছে পোড়ামাটির ভাস্কর্য, রাজা, সম্রাট-সুলতান-নবাবদের ব্যবহৃত যুদ্ধাস্ত্র, রানী ভবানীর স্মৃতি চিহ্ন, মনসা মঙ্গলের বেদি-ঘট, বগুড়ার কবি রুস্তম আলী কর্নপুরীর দলিল-দস্তাবেজ ও উপ-মহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের সংগৃহীত ঐতিহাসিক কিছু নিদর্শন।
খুবজীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিকুল ইসলাম জানান, ‘জায়গার জটিলতা ও রাজস্ব আদায় না হওয়ার অজুহাতে জাদুঘরটি একসময় অন্যত্র স্থানান্তরের চেষ্টা করেছিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর। এলাকাবাসীর প্রতিবাদে তা সম্ভব হয়নি। এখনও নতুন ভবন নির্মাণ নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা।’
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে ৮ শতাংশ জায়গায় জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক দুর্লভ সামগ্রী জড়ো করা হয় তখন। পরে জাদুঘরটির উন্নয়নের লক্ষ্যে নরওয়ে সরকারের প্রজেক্ট নরওয়ে এজেন্টি (নোরাট) এক লাখ ২০ হাজার টাকা অনুদান দেয়। যা দিয়ে জাদুঘরের পাকা দোতলা ভবন বানানো হয়।
পরে জাদুঘরটির সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে এটাকে মহাস্থান জাদুঘরের অধীন করা হয়। নিয়োগ দেওয়া হয় একজন কর্মকর্তা ও তিন জন কেয়ারটেকার। সর্বশেষ একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ করা ছাড়া সরকারিভাবে আর কোনও উন্নয়ন কার্যক্রম হয়নি।
দোতলা ভবনের ওপরের তলার তিনটি কক্ষ ব্যবহারের অনুপোযোগী হওয়ায় ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন নিচের দুটি কক্ষে নিদর্শনগুলো আছে। অফিসে কর্মকর্তা পর্যায়ের কেউ নেই। ভবনটির দীর্ঘদিন সংস্কারও হচ্ছে না।
খুবজীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মনিরুল ইসলাম দোলন বলেন, জাদুঘরে যাওয়ার জন্য সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। এখন লোকবল ও রক্ষণাবেক্ষণ দরকার। এর অভাবেই জাদুঘরটি দর্শক হারাচ্ছে।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বগুড়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, ‘ঢাকায় রাসায়নিক পরীক্ষা শেষে চলনবিল জাদুঘরের সামগ্রী নিরাপত্তার কারণে মহাস্থানগড়ে রাখা হয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই জাদুঘরের ৮ শতক জায়গার মধ্যে পাশের স্কুল ও ক্লাব ৪ শতক দখল করে নেওয়ায় নতুন ভবন করতে সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভবন নির্মাণ শেষে সামগ্রীগুলো ফেরত পাঠানো হবে।’