২ মাস ধরে একঘরে ট্রান্সজেন্ডার হোচিমিনের পরিবার

বগুড়ায় পাঁচ পরিবারকে দুই মাস ধরে একঘরে করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে হোচিমিন ইসলাম নামে এক ট্রান্সজেন্ডার (রূপান্তরিত) নারীর পরিবারও রয়েছে। জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনার সূত্রপাত বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

হোচিমিন বগুড়া সদরের নিশিন্দারা ইউনিয়নের বারোপুর তালুকদারপাড়ায় মৃত নজরুল ইসলামের মেয়ে। তিনি ঢাকায় চাকরি করেন। বাড়িতে তার মা রেহেনা খাতুন ও বোন নিলুফা ইয়াসমিন থাকেন। নিলুফার স্বামী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামে আছেন। দুই সন্তান স্থানীয় স্কুলে লেখাপড়া করে। 

জানা গেছে, হোচিমিন ব্যক্তিগত ইচ্ছায় ২০২০ সালে ট্রান্সজেন্ডারে রূপান্তরিত হন। বিষয়টি জানাজানি হলে গ্রামবাসীরা হোচিমিনের পরিবার নিয়ে নানা ধরনের কটূক্তি করেন।

হোচিমিন বলেন, ‘ভারতে ট্রান্সজেন্ডারের মাধ্যমে নারী হয়েছি। আমি ঢাকায় চাকরি করি। কিছুদিন আগে চাচা রেজাউল করিম আমার মাকে বলেন, দুই জন মেয়ে হওয়ায় তারা আইন অনুসারে ভাইয়ের (হোচিমিনের বাবার) সম্পত্তির ভাগ পাবেন। এ নিয়ে তিনি গ্রামের লোকজনের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। জমির ভাগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের একঘরে করে রাখার পরিকল্পনা করেন। হুমকি-ধমকি দেওয়া শুরু করেন তিনি। বাধ্য হয়ে সদর থানায় জিডি করি। গত ১৩ মার্চ থানায় ডেকে আপস করে দেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘থানায় ডাকায় চাচা আমার পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ হন। সর্বশেষ গত শব-ই-বরাতের রাতে গ্রামবাসীদের ডাকেন। সেখানে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেয়, গ্রামের কেউ আমাদের সঙ্গে মেলামেশা ও কথা বলতে পারবে না।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শব-ই-বরাতের রাতে বৈঠকে রেজাউল করিম, নিশিন্দারা ইউনিয়নের সাবেক সদস্য আহসান হাবিব হারুন, রাহিজুল ইসলাম তালুকদার, খায়রুল ইসলাম ও শাহীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। হোচিমিন ঢাকা থেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯- এ কল দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় মাতবররা সটকে পড়েন।

হোচিমিনের বোন নিলুফা বলেন, ‘শব-ই-বরাতের দিন আমাদর একঘরে করার পর থেকে পরিবারে অশান্তি দেখা দেয়। একঘরে করে রাখায় জড়িতদের পরিবারের সদস্যরা গালগালি ও হোচিমিনকে দায়ী করেন। তারা আমাদের সন্তানদের সঙ্গে তাদের সন্তানকে মিশতে দেয় রা। পাড়ার দুটি দোকান থেকে আমরা কিছু কিনতে গেলে দেওয়া হয় না। বাধ্য হয়ে ৪-৫ কিলোমিটার দূরে ঘোড়াধাপ হাট বা শহরের বাজারে যেতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাতবরদের কথা অমান্য করে আতাউর রহমান, শাহজাহান আলী তালুকদার, লুৎফর রহমান, ইমরুল হোসেন ও তাদের পরিবার আমাদের সঙ্গে মেলামেশা করায় তাদেরকেও একঘরে করা হয়েছে। বর্তমানে মাতবররা হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। এতে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে আতঙ্কিত। পুলিশের
পরামর্শে আবারও থানায় জিডি করেছি। গত ১১ মে পুলিশ দুই পক্ষকে থানায় ডেকে আপস করে দেয়। কিন্তু এলাকায় ফিরে প্রভাবশালী মাতবররা আগের মতো আচরণ করতে থাকেন।’

ভুক্তভোগী ইমরুল হোসেনের স্ত্রী নাদিয়া বলেন, ‘থানায় আপসের পরদিন আমাদের বাড়ির বর্জ্য-পানি যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আতাউরের বাড়ির বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও পরে ঠিক করা হয়েছে।’

ভুক্তভোগী শাহজাহান আলী তালুকদার অভিযোগ করে বলেন, ‘হোচিমিন নারীতে রূপান্তর হওয়াকে কেন্দ্র করে এসব সমস্যা হয়েছে। তার পরিবারকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। আর এসবের মূল হোতা হোচিমিনের চাচা রেজাউল করিম। পরে রেজাউল কিছুটা থামলেও হারুন, রাহিজুল ও খায়রুলরা হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন।’

হোচিমিনের প্রতিবেশী শাহজাহান আলী জানান, ওই পরিবারের পক্ষে কথা বলায় তাকে একঘরে করা হয়েছে। দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে নিষেধ করা হয়েছে।

তবে স্থানীয় এক দোকানি লিটন বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘হোচিমিনরা আমার দোকান থেকে কিছু কেনেন না। আকিকার গোশত দেওয়া হলেও হোচিমিনের মা রেহেনা খাতুন নেননি।’ 

হোচিমিনের স্কুল জীবনের বন্ধু চুমকি আকতার জানান, গ্রামের মাতবররা হোচিমিনকে ‘হিজরা’ বলে হেয় করে। তাদের বাড়িকে হিজরার বাড়ি বলে গালাগালি করে থাকেন।

এ বিষয়ে হোচিমিনের চাচা রেজাউল করিম বলেন, ‘গ্রামে বিচার না চেয়ে হোচিমিন আমাকে থানায় নিয়ে যায়। এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শরিক হিসেবে জমির ভাগ চেয়েছিলাম। তাদের কাছে জমি পাওয়ার দাবি করেছিলাম, কিন্তু আত্মীয় মনে করে ভাগ চাইনি। পরে কোনও সমস্যা করা হবে না মর্মে থানায় মুচলেকা দেওয়া দিয়েছি।’

বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, হোচিমিনের বিষয়টি পুলিশ অবগত। এর আগে তাদের আইনগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙখলা পরিস্থিতি নিয়ে কোনও সমস্যা হলে পুলিশ সহায়তা করবে।