নিজের মেয়েকে হত্যা করে প্রতিবেশীকে আসামি করে ১৮ বছর মামলা চালিয়েছেন বাবা

প্রতিবেশীকে শায়েস্তা করতে নিজ মেয়েকেই খুন করেছিলেন বাবা। এরপর থানায় গিয়ে প্রতিবেশীকে আসামি করে মামলাও করেন। আর এই হত্যাকাণ্ডের ১৮ বছর পর রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে রাজশাহী পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের তথ্য জানান পিবিআই-এর রাজশাহী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ।

তিনি জানান, ২০০৪ সালের ১০ জুন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার লক্ষ্মীনগর গ্রামে ১৩ বছরের মেয়ে শিশুকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ওই শিশুর বাবা আকসেদ আলী সিকদার ২০ জনের নাম উল্লেখ করে রাজশাহীর বাঘা থানায় মেয়ে হত্যার মামলা করেন। আর জমিজমা নিয়ে তার সঙ্গে প্রতিবেশী মোল্লা বংশের সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে বিরোধ চলে আসছিল। তাদের সঙ্গে কোনোভাবে পেরে উঠতে না পেরে নিজের সন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরে সেই হত্যার দায় মোল্লা বংশের ওপর চাপিয়ে দেন। আর এই লম্বা সময় ধরে আদালতে মামলার বিচারও চলছিল। প্রায় দেড় যুগ পর পিবিআই তদন্তে সেই রহস্য উন্মোচিত হলো।

সংবাদ সম্মেলন আবুল কালাম আজাদ জানান, এই মামলার বিচার চলাকালে আদালতের মনে হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে, তারা প্রকৃতপক্ষে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। তাই এটি পুনরায় তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করা প্রয়োজন। এ জন্য পিবিআইকে এই হত্যা মামলাটি পুনঃতদন্ত করতে দিয়েছিলেন আদালত। পরে পিবিআইয়ের তদন্তে বেরিয়ে আসে, অন্য কেউ নয় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের মেয়েকে খুন করেছিলেন তার বাবা নিজেই। তবে আকসেদ আলী ২০১৯ সালে মারা গেছেন। তার দুই স্ত্রী ভায়েলা বেওয়া (৬৫) ও আফিয়া বেওয়া (৬০) গত রবিবার (৯ এপ্রিল) আদালতে হাজির হয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এ সময় আদালতকে জানিয়েছেন, এতদিন স্বামীর ভয়ে তারা মুখ খুলতে সাহস পাননি।

এদিকে, মামলার এজাহারে বলা হয়েছিল, ঘটনার দিন রাত ১১টার দিকে দুই স্ত্রী এবং মেয়েকে নিয়ে বসেছিলেন আকসেদ। বাড়ির দিকে হঠাৎ ৫০-৬০ জনকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আসতে দেখে দুই স্ত্রী তাকে পালিয়ে যেতে বলেন। আকসেদ আলী পালিয়ে গেলে প্রতিপক্ষরা তার ১৩ বছরের কিশোরীকে কুপিয়ে হত্যা করে চলে যায়। এই মামলায় একই গ্রামের প্রতিপক্ষ মোল্লা বংশের ২০ জনকে আসামি করা হয়।

এই হত্যা মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করে। পরে অধিকতর তদন্তের জন্য ডিবি পুলিশকে দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ ২০০৪ সালের ৩০ নভেম্বর ২০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর রাজশাহীর জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন আদালতে মামলার বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ সময় বিচার চলার পর আদালতের সন্দেহ হলে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য ২০২২ সালের মে মাসে পিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে রাজশাহী পিবিআইয়ের এসআই খায়রুল ইসলাম মামলাটি তদন্ত করেন।

প্রকাশ্যে ও গোপনে তদন্তের এক পর্যায়ে পিবিআইর এ কর্মকর্তা জানতে পারেন, প্রতিপক্ষরা নয়, আকসেদ আলীই নিজের মেয়েকে হত্যা করেছিলেন। তার দুই স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় সবকিছুই স্বীকার করেন তারা।

পিবিআই-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ আরও জানান, এ ঘটনার সঙ্গে আকসেদ আলী সিকদার ছাড়া অন্য কেউ জড়িত ছিলেন সে রকম কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। আকসেদ আলী ২০০৯ সালে মারা যাওয়ায় মামলার অভিযোগপত্র আর দাখিল করা যাবে না। একটি তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে। তারপর আদালত এ মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা।