বরেন্দ্র অঞ্চলে অস্বাভাবিক হারে নিচে নামছে পানির স্তর, ব্যাহত কৃষিকাজ

প্রতি বছরই বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে নিচে নামছে। কমেছে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। এতে দৈনন্দিন ব্যবহৃত পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। অনেক জায়গায় পুকুর পর্যন্ত শুকিয়ে চৌচির হয়েছে। কৃষিতেও পড়েছে বিরূপ প্রভাব। শস্য ও দানাজাতীয় আবাদের বিপ্লব ঘটানো বরেন্দ্র অঞ্চলে ব্যাপক হারে গড়ে উঠছে ফলের বাগান। তবে সুবিধাবাধী গোষ্ঠী ব্যক্তিস্বার্থে এখনও তৎপর। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত, বিশেষজ্ঞরাও উদ্বিগ্ন। কিন্তু সমাধানের পথে হাঁটছেন না কেউ।

নগরীর অদূরে পবা উপজেলা। এই উপজেলার দামকুড়া ইউপি বরেন্দ্রের অন্য এলাকাগুলোর চেয়ে অনেকটাই নিচু। এখানে দুই বছর আগেও পানির সংকট ছিল না। এখন অনেক টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। অনেক পুকুর শুকিয়ে গেছে। আবার যেসব পুকুরে পানি আছে, সেখানেও পানির পরিমাণ খুবই কম। মাছ চাষেও পড়েছে বিরূপ প্রভাব।

পবা উপজেলার দামকুড়ার মুরারীপুর এলাকার বাসিন্দা লিপি বেগম (৫৫) জানান, গত এক মাস থেকে তিনি টিউবওয়েলে পানি পাচ্ছেন না। আশপাশে আরও অনেকের টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। আগে আশপাশে এমন সমস্যা তেমন একটা দেখেননি। শুধু টিউবওয়েল নয়, তার বাড়ির পাশের অনেক পুরনো একটি পুকুর শুকিয়ে গেছে। যা বিগত বছরগুলোতে শুকায়নি। এখন বাসা থেকে দূরে একটি পুকুরে গোসল করতে যাচ্ছেন। তবে সেখানেও পানি খুবই কম। পানির চেয়ে কাদা বেশি।

একইভাবে পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে নিচে নেমে যাওয়ায় বাঘা উপজেলায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষজন। উপজেলার গভীর নলকূপের সংখ্যা ৪৫টি ও অগভীর নলকূপ ১৪ হাজার ৪২৮টি। এর মধ্যে অনেক নলকূপে পানি মিলছে না।

পানির সংকটে কৃষিতে পড়েছে বিরূপ প্রভাব

বাঘা উপজেলার আড়ানী পৌরসভার গোচর গ্রামের শিরিন সুলতানা বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে বাড়িতে বসানো সাধারণ যন্ত্রচালিত মোটরে পানি উঠছে না। পানির সংকটে খুব কষ্টে আছি আমরা।’ 

উত্তর মিলিক বাঘা গ্রামের নাসির উদ্দীন বলেন, ‘বাড়ির টিউবওয়েলে ১৭০ ফুট পাইপ বসিয়েছি। এরপরও পানি উঠছে না। বিদ্যুৎ চালিত মোটর বসানো আছে, সেখানেও পানি মিলছে না।’

পানি সংকটের কথা জানিয়ে বাঘা বাজারের বাদশা কপি হাউজের মালিক মোহাম্মদ বাদশা বলেন, ‘আমার দোকানে বিদ্যুৎ চালিত মোটরে পানি উঠছে না। ফলে দোকান চালাতে গিয়ে খুব হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ ছাড়া আমার বাড়িতে বসানো টিউবওয়েলেও পানি উঠছে না। ফলে পানির সংকটে খুব বেকায়দায় পড়েছি।’

বাঘায় পদ্মার চরে খরায় শুকিয়ে কুঁচকে যাচ্ছে পাট গাছের পাতা। এ ছাড়া বৃষ্টির অভাবে পদ্মার চরে মরে যাচ্ছে পাট। একাধিকবার সেচ দিয়েও ক্ষেতের পাট বাঁচাতে পারছেন না কৃষকরা।

উপজেলার কোথাও কোথাও ৩০-৩৫ ফুট পানির স্তর নিচে নেমেছে বলে জানালেন বাঘা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের সহকারী প্রকৌশলী কে এম নাসির উদ্দীন। তিনি বলেন, ‘পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি না হওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে সমস্যা থাকবে না।’

বাঘা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় চলতি মৌসুমে পাঁচ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে  পাট চাষ হয়েছে। গত বছর চার হাজার ৫৬৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল।

কৃষিজমি শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে

চলতি মৌসুমে বর্গা নিয়ে তিন বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন বাঘার কালীদাশখালী চরের আশরাফুল ইসলাম। প্রচণ্ড খরায় জমির বেশিরভাগ পাট গাছ পুড়ে মরে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন এই কৃষক।

বাঘা পৌর এলাকার গাওপাড়া গ্রামের আমিরুল ইসলাম সড়ক ঘাটের নিচে কালীদাশখালী পদ্মার চরে আড়াই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। বৃষ্টির অভাবে জমির অধিকাংশ পাট গাছ পুড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বৃষ্টি হচ্ছে না। মাঠ ঘাট শুকিয়ে যাচ্ছে। খরায় পাট গাছের পাতা শুকিয়ে কুঁচকে গেছে।’

বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান বলেন, ‘দীর্ঘদিন এলাকায় বৃষ্টি না হওয়ায় মাঠে রোপণ করা পাট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে পদ্মার বালুচরে যে আবাদ হবে, সেই আবাদ না করে চাষিরা অন্য আবাদ করে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হন। চরে বাদামের আবাদ করলে হয়তো এই ক্ষতিটা হতো না।’

নওগাঁর মান্দা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৫ জুন পর্যন্ত ১২৯০ হেক্টর জমিতে আউশ রোপণ করা হয়েছে। উপজেলায় এই মৌসুমে বিআর-২১, ব্রি-ধান ৪৮, ৭৫, ৫৫, ৬৩ ও ৫৬ জাতের ধান চাষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অধিকাংশ এলাকায় পানির সংকটে ধান রোপণ করতে পারছেন না কৃষকরা।

এমনটি জানিয়ে মান্দা উপজেলার নাড়াডাঙ্গা গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, ‘চলতি মৌসুমে ১০ বিঘা জমিতে আউশ ধানের আবাদ করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় সেচ দিয়ে আড়াই বিঘা জমিতে চারা রোপণ করেছি। অবশিষ্ট জমি খালি পড়ে আছে। বৃষ্টিপাত না হলে রোপণ করবো না।’

অনেক টিউবওয়েলে পানি উঠছে না

মান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শায়লা শারমিন বলেন, ‘মূলত বৃষ্টির পানিতে আউশ ধানের আবাদ হয়। কিন্তু এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় মাঠগুলোতে ধান রোপণ তেমন শুরু হয়নি। সেচ দিয়ে কেউ কেউ রোপণ করেছেন। তবে বৃষ্টি না হলে পুরোদমে রোপণকাজ শুরু হবে না।’

পানির অভাবে আউশ আবাদেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সময় পেরিয়ে গেলেও বৃষ্টি না হওয়ায় আউশ রোপণ করতে পারছেন না চাষিরা। গভীর নলকূপগুলোতে উত্তোলিত পানির পরিমাণ কম। অনেক জায়গায় গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না।

গোদাগাড়ী উপজেলার সাবিয়ার আলী বলেন, ‘এই সময়ে আউশ লাগানো শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এবার এখনও বৃষ্টি না হওয়ায় আউশ লাগানোর প্রস্তুতি নিতে পারিনি।’

বৃষ্টির না হওয়ায় এবার আউশের আবাদে দেরি হচ্ছে উল্লেখ করে রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক শামসুল ওয়াদুদ বলেন, ‘ইতোমধ্যে বৃষ্টি হতে শুরু করেছে। সমস্যা আর দীর্ঘায়িত হবে না বলে মনে করছি। আউশের আবাদ এবার কমবে কিনা, এটা এখনই বলা যাচ্ছে না।’

জলবায়ু পরিবর্তন ও অনাবৃষ্টির কারণে প্রকৃতির স্বাভাবিক কাজে বিঘ্ন ঘটছে বলে জানালেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনিস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও বর্তমান ভিসি প্রফেসর ডা. গোলাম সাব্বির সাত্তার। তিনি বলেন, ‘নদীর উৎসের অববাহিকায় বৃষ্টিপাত কম ও ভারতের অভ্যন্তরে সময়ে-অসময়ে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এখানে। ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে নদীর স্তরের একটা সংযোগ রয়েছে। কোনও কোনও সময় ভূগর্ভস্থ পানি নদীতে আবার নদী থেকে পানি ভূগর্ভস্থ স্তরে রিচার্জ হয়ে থাকে।’

পানির সংকটে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত

দিন দিন এই অঞ্চলে পানির পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খনিজ পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান। তিনি বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানিতে সব মানুষের অধিকার থাকলেও অল্প কিছু লোক তা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে তুলে নিচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় ২৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার ঝিলিম ইউনিয়নে কমপক্ষে ৩৫টি অটোরাইস মিল আছে। যেগুলো প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে। এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে মাটির নিচের পানির স্তরে।’

চৌধুরী সারওয়ার জাহান আরও বলেন, ‘২০১৮ সাল পর্যন্ত সাত বছরে এই অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাত কখনও ১৪০০ মিলিমিটার অতিক্রম করেনি। যা জাতীয় গড় ২৫৫০ মিলিমিটার থেকে ৪৫ শতাংশ কম।’

গোটা উত্তরাঞ্চলের পাতাল প্রায় পানিশূন্য বলে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি জামাত খান। তিনি বলেন, ‘সরকারি সংস্থার জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। শুধু রাস্তা আর বিল্ডিং মানে উন্নয়ন নয়; উন্নয়নের পূর্বশর্ত পানি। কিন্তু পদ্মায় পানি নেই। পুকুরে পানি নেই। টিউবওয়েলে পানি নেই। এই অবস্থার উত্তরণে সমাধানের পথটা কবে প্রশস্ত হবে, তা আমাদের জানা নেই।’