চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বিভীষণ সীমান্তে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে করিডোরবিহীন গরু আনতে বিজিবি উৎসাহিত করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব গরু প্রতি বিজিবি ২/৫ হাজার করে টাকা নিচ্ছে। স্থানীয় গরু ব্যবসায়ী, বিট মালিক ও রাখালদের অভিযোগ, সরকারি অনুমোদিত বিটে বিজিবি’র অসহযোগিতা, রাখালদের নির্যাতন, ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিজিবি।
নিরাপত্তাহীনতা কারণে সরকারের অনুমোদিত বিটে ব্যবসায়ীরা গরু আনতে অপরাগতা প্রকাশ করায় বিটটি গত ১৭ দিন যাবত এক প্রকার বন্ধ রয়েছে। এতে সরকার লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
সমস্যা সমাধানে গরু ব্যবসায়ীরা লিখিত ও মৌখিকভাবে প্রশাসনকে জানালেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে বিজিবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগের সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরজমিনে পরিদর্শন ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সীমান্তে ভারতীয় গরু আনা-নেওয়া এবং গরুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্তে গবাদি পশুর বিট করা হয়েছে। বিট করা প্রতি গরু বৈধকরণে কাস্টমসের ৫০০ টাকা ফি’র মাধ্যমে করিডোরের ছাড়পত্র নিয়ে নির্বিঘ্নে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান দেওয়া হয় এবং কেনাবেচায় সহজীকরণের উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নে ৪৩ বিজিবি’র অধীনস্থ বিভীষণ বিওপি’র পাশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মেসার্স দিপ্ত টেডার্সের প্রোপাইটার মো. আলমগীর ইসলাম বিট পরিচালনার অনুমতি পেয়ে গত ৯ নভেম্বর থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০ হাজার ৭৭৬টি গরুর করিডোর বাবদ ৫৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা সরকারের রাজস্ব আদায়ে সহায়তা করে।
কিন্তু অভিযোগ পাওয়া গেছে, বিভীষণ বিওপি’র কমান্ডার বাশেদ আলী গরু ব্যবসায়ীদের ভারত থেকে আমদানি করা গরু করিডোর না করে বিজিবিকে গরু প্রতি ২ হাজার টাকা দিয়ে অবৈধপথে গরু নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। কমান্ডারের কথামতো যেসব রাখাল বা ব্যবসায়ীরা একাজ করছে না তাদের গরু আটক করে নিলাম করে দিচ্ছে। এতে স্বল্প পুঁজির গরু ব্যবসায়ীরা ক্ষতি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি গোমস্তাপুর উপজেলার রোকনপুর গ্রামের গরু ব্যবসায়ী খাইরুল ইসলামের কাস্টমসের করিডোর ও বিট করা ১৮টি, ইসলাপুর গঞ্জের আনারুলের ১৪টি এবং জশৈল গ্রামের মোস্তাকিম হোসেনের ৭টিসহ মোট ৩৯টি গরু বিওপি কমান্ডার বাশেদ আলী ক্ষমতার অপব্যবহার করে মালিকবিহীন আটক দেখিয়ে নিলাম করায় ওসব ব্যবসায়ীদের প্রায় ১৭ লাখ টাকা ক্ষতি করে। তবে ওই তিনজন ব্যবসায়ী তাদের বিট ও করিডোর করা ৩৯টি গরুর মালিক বা দাবিদার হিসেবে রহনপুর কাস্টমসে মামলা করা করেছে।
এদিকে, বিভীষণ সীমান্তে এত বিপুল পরিমাণ গরু নিলামের কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গরু ব্যবসায়ীরা এখন কমান্ডারের কথামতো গরু প্রতি ২হাজার টাকা প্রদান শেষে করিডোর বা বিট না করে অবৈধপথে প্রতিদিনই গরু দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছে। ফলে গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে এ বিটে করিডোরের ছাড়ের পরিমাণ একেবারে কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের রাজস্বও কমে গেছে।
গরু ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম, ফারুক আলম, আনারুল ইসলামসহ রাখালরা জানান, তারা গরু পরিবহনে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বৈধভাবে করিডোর করে গরু আনার চিন্তাভাবনা করলে তাদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালাচ্ছে বিজিবি। আর বিজিবি’র জোরপূর্বক গরু প্রতি ২ হাজার টাকা আদায়ে সহায়তা করছে স্থানীয় একটি দালাল চক্র। এমনকি যেসব রাখাল বিজিবি’র ২হাজার টাকা এবং কথামতো গরু আনছে না তাদের হয়রানি এবং মামলা দিয়ে ইতোমধ্যে কয়েকজনকে চালান দেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন, এই সীমান্ত দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন গড়ে ২৫০-৩৫০ টি গরু দেশে প্রবেশ করে।
এদিকে বিট মালিক আলমগীর ইসলাম ভারত থেকে আনা গরু বিটে প্রবেশ ও করিডোর নিশ্চিত এবং নিরাপত্তা চেয়ে গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা টাস্কফোর্সের সভাপতি বরাবর আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু আসছে। ভারতীয় রাখালরা জিরো পয়েন্টে গরু নিয়ে আসে এবং বাংলাদেশি রাখাল ও ব্যবসায়ীরা বিজিবি’র সহায়তায় তা গ্রহণ করে। বিট ও করিডোরের মাধ্যমে তা দেশের বিভিন্নস্থানে কেনা-বেচার জন্য নেওয়া হয়। কিন্তু গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিভীষণ বিওপি’র কোম্পানি কমান্ডার বাসেদ আলী কিছু বিট ও করিডোর করা গরু মালিকবিহীন দেখিয়ে নিলাম করায় ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তবে কমান্ডার নিজের পকেটস্থ করার জন্য গরু ব্যবসায়ীদের করিডোরবিহীন গরু আনতে উৎসাহিত ও চাপ সৃষ্টি করে আসছে।
আর প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিভিন্নস্থানে কেনাবেচার জন্য এসব করিডোর বিহীন গরু নিরাপদ নয়। যার কারনে তারা গরু আনতে সাহস পাচ্ছেনা। এতে সরকার লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। তবে বর্তমানে সীমান্ত দিয়ে যে পরিমাণ গরু আসছে তা বিজিবি ও স্থানীয় একটি দালাল চক্রকে ২/৫ হাজার টাকা দিয়ে করিডোর বিহীন এসব গরু দেশের বিভিন্নস্থানে পাঠাচ্ছে কিছু সুযাগ সন্ধানী ব্যবসায়ী।
এছাড়া সমস্যাটির সমাধানে গরু ব্যবসায়ীরা ৪৩ বিজিবি’র অধিনায়ককে জানালেও এখন পর্যন্ত কোন প্রতিকার হয়নি।
এদিকে, সরকারের রাজস্ব আয় ও গরুর নিরাপত্তা নিশ্চিতে জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন আব্দুল হাকিম, ফারুক আলম, আনারুল ইসলাম ও আলমসহ একাধিক গরু ব্যবসায়ী, রাখাল ও বিট মালিক।
এ ব্যাপারে ৪৩ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল জাহিদ হাসান জানান, ভারত থেকে গরু আসা কম-বেশি হবে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তারপরও গরু আসছে, আর করিডোরবিহীন গরু পাওয়া গেলে তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে করিডোরবিহীন গরু আনতে বিজিবি’র কোন সদস্য উৎসাহিত করলে এবং অবৈধ টাকা গ্রহণ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিজিবি’র এই কর্মকর্তা।
/এসটি/টিএন/