রাজশাহীতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই চিকিৎসককে ছুরিকাঘাত ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পৃথক মামলা হয়েছে। এ ঘটনার পর রাজশাহী নগরীতে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিসহ চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে চিকিৎসক সংগঠনগুলো।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের সাবেক ছাত্র ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. গোলাম কাজেম আলী আহমাদের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ) ও ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)।
সোমবার (৩০ অক্টোবর) পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে এনডিএফ সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. সাজেদ আব্দুল খালেক এবং বিএমএ সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ বি সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক ডা. নওশাদ আলী গভীর শোক প্রকাশ করে শাস্তির দাবি জানান।
বিএমএ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সোমবার রাজশাহীতে সব ধরনের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধের ঘোষণা দেয়। এ ছাড়া মঙ্গলবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১০টায় মানববন্ধন ও কালো ব্যাজ ধারণসহ খুনিদের দ্রুত বিচারের জন্য পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
এদিকে, এনডিএফ নেতারা চিকিৎসকদের ওপর ধারাবাহিক নিরাপত্তাহীনতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খুনিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, রবিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় গ্রাম্য চিকিৎসক এরশাদ আলী দুলালকে (৪৫) তার বাড়ি নগরীর উপকণ্ঠ কচুয়াতৈল এলাকায় অবস্থিত ফার্মেসি থেকে তুলে নিয়ে যায় একদল সন্ত্রাসী। পরে নগরীর সিটি হাট এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. গোলাম কাজেম আলী আহমাদকে নগরীর বর্ণালী এলাকায় ছুরিকাঘাত করা হয়। স্থানীয়রা হাসপাতালে নিয়ে তাৎক্ষণিক আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
দুই ঘটনায় নগরীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিরাপত্তাহীনতার কঠোর সমালোচনা করছেন অনেকেই।
নগরবাসীর ভাষ্য, রবিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে দুটি ঘটনা প্রায় একই ধরনের। দুই জনকে সিনেম্যাটিক স্টাইলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। একজনকে অপহরণ করে ঘণ্টাখানেক পরই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আরেকজনকে মাইক্রোবাস থেকে নেমে ছুরিকাঘাত করে হত্যা। আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারসহ শান্তির শহরে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি রাজশাহীবাসীর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাজেমের সহকর্মী ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের লক্ষ্মীপুর শাখার এক চিকিৎসক বলেন, তিনি খুব মেধাবী ডাক্তার ছিলেন। ছিনতাইয়ের উদ্দেশে তাকে হত্যা করা হয়নি। ছিনতাই হলে তার ম্যানিব্যাগ ও মোবাইল নিয়ে পালিয়ে যেত। আসলে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা উচিত।
নগরীর উপশহর এলাকার এক পারভীন সুলতানা নামের এক গৃহিণী বলেন, রাতে ঘুমিয়ে সকালে এই ধরনের খবর দেখতে চাই না। শান্তির শহরে অশান্তি নিয়ে আমরা ঘোরাফেরা করতে চাই না। নিরাপত্তা আরও জোরদার করা উচিত।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) জামিরুল ইসলাম জানান, রবিবার রাতে এক মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টিটিভের মোটরসাইকেলে করে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন ডা. কাজেম। সেখানে মাইক্রোবাস থেকে তিন জন নেমে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে দ্রুত রামেক হাসপাতালে নিয়ে আসে। তাকে হাসপাতালে ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখানে তা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত তাকে আইসিইউতে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, ডা. কাজেম আলী রাজশাহী অঞ্চলের নামকরা চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস ৪২তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগী দেখতেন। এ ছাড়াও নগরীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল এবং পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তিনি নিয়মিত রোগী দেখতেন।
সোমবার দুপুরে ডা. কাজেম হত্যায় নগরীর রাজপাড়া থানায় মামলা করেছেন তার স্ত্রী ডা. ফারহানা ইয়াসমিন। মামলার এজাহারে আসামি অজ্ঞাত উল্লেখ করা হয়েছে।
নগরীর রাজপাড়া থানার ওসি রফিকুল হক বলেন, ডা. কাজেম আলীর লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার স্ত্রী থানায় এসে মামলা করেছেন। তদন্ত চলছে। বেশকিছু সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। আশা করা যাচ্ছে, দ্রুতই এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনসহ আসামিদের গ্রেফতার করা যাবে।
রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানার ওসি রফিকুল হক জানান, তিন জন মাইক্রোবাস থেকে নেমে প্রথমে পেছন থেকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে চিকিৎসক কাজেম আলীকে। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার সঙ্গে একজন মোটরসাইকেল চালক ছিলেন। তার নাম শাহীন। তিনি গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের মেডিক্যাল প্রতিনিধি। তার সঙ্গে প্রায় যাওয়া আসা করতেন গোলাম কাজেম আলী আহমেদ।
এই ওসি আরও জানান, একটি সিলভার কালার মাইক্রোবাস প্রথমে চিকিৎসক কাজেমকে বহনকারী মোটরসাইকেলটিকে চাপা দেয়। এতে চালক বাধ্য হয়ে রাস্তার বাম পাশে মোটরসাইকেল দাঁড় করান। এরপর মাইক্রোবাস থেকে নেমে তিন জন প্রথমে লাঠি দিয়ে আঘাত করে চিকিৎসককে। এ সময় চালক শাহীনকে চলে যেতে বলে। শাহীন মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যেতে গিয়ে দেখেন, পেছনে চিকিৎসক পড়ে আছেন। তার শরীর থেকে রক্তপাত হচ্ছে। এরপর তিনি রাস্তায় বসে চিৎকার দিতে থাকেন। দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায় মাইক্রোবাসে করে। পরে রাস্তার লোকজন আহত চিকিৎসককে ধরাধরি করে রক্তাক্ত অবস্থায় রামেক হাসপাতালে নেন। সেখানে মারা যান।
এদিকে, নিহত গ্রাম্য চিকিৎসক এরশাদ আলী দুলাল হোমিও চিকিৎসা দিতেন। রবিবার সন্ধ্যায় তাকে নিজ এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়। রাত ৯টার দিকে নগরীর শাহমখদুম থানার সিটিহাট এলাকা থেকে তার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তাকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
শাহমখদুম থানার ওসি ইসমাইল হোসেন জানান, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে স্বজনরাই তাকে অপহরণ করে বলে পরিবার অভিযোগ করে। অপহরণের পর চন্দ্রিমা থানায় একটি অভিযোগও করা হয়। এর তিন ঘণ্টার মধ্যে শাহমখদুম থানা এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়।
চন্দ্রিমা থানার ওসি মাহবুব হোসেন জানান, নিহত দুলালের ভাই রুহুল আমিন বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৭ থেকে ৮ জনের নামে মামলা করেছেন। এর আগে পরিবার অপহরণের অভিযোগ করেছিল। আমরা সবকিছু মাথায় নিয়ে তদন্ত করছি। তবে হত্যাকাণ্ডটি জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে হতে পারে।
এদিকে, ডা. কাজেমকে ছুরিকাঘাতে হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে দেবীনগর স্টুডেন্টস কমিউনিটি। সোমবার দুপুরে নগরীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এ ছাড়া ডা. কাজেমসহ দুই চিকিৎসকের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাজশাহী মহানগরীর নেতৃবৃন্দ উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন।
বিবৃতিতে জামায়াতের নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশে আজ চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে। এর ব্যতিক্রম রাজশাহী মহানগরীও নয়। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।