রথযাত্রায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ৫ জনের মৃত্যু

কাঠের পরিবর্তে লোহার ব্যবহারই হলো কাল

বগুড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রথযাত্রার জন্য তৈরি রথটি কাঠের পরিবর্তে লোহা দিয়ে বানানো হয়েছিল। সেইসঙ্গে ২৫ ফুট উচ্চতায় রথের চূড়া অর্থাৎ রডটি ওঠানো হয়েছে। ফলে শহরের রাস্তার ওপর দিয়ে যাওয়া ১২ মিটার উচ্চতার ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের তারের সঙ্গে রথের চূড়ার রডটি লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ।

রথটি তৈরি করেছেন শহরের সেউজগাড়ি এলাকার শ্রীশ্রী ইসকন মন্দিরের দায়িত্বশীলরা। রথযাত্রায় অংশ নিয়েছেন শহরের বিভিন্ন মন্দিরের পুরোহিত, ব্রহ্মচারী ও ভক্তসহ প্রায় ১৫ হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী। মঙ্গলবার (০৯ জুলাই) দুপুরে শহরের একাধিক মন্দিরের পুরোহিত, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি, দায়িত্বশীল ও ভক্তের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রথটি কাঠের পরিবর্তে লোহা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল।

পুরোহিত, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস জগন্নাথ দেব হলেন জগতের অধীশ্বর। তার মূর্তি সাধারণত কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। নিম্ব বৃক্ষ বা নিম গাছের কাঠ দিয়ে জগন্নাথ দেবের প্রধান বিগ্রহগুলো (জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা) নির্মিত। জগন্নাথের সবচেয়ে বিখ্যাত উৎসবটি হলো রথযাত্রা। এই উৎসবের সময় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি মূল মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে বের করে কাঠের তৈরি রথে করে আরেক মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার নিয়ে আসা হয়। ভক্তরাই রথ টেনে নিয়ে যান। যেখানে জগন্নাথ মন্দির আছে, সেখানেই এই ধরনের রথযাত্রার আয়োজন করা হয়।

তারা জানান, রাজার জন্য রথ নির্মাণের কাঠ সোনার কুঠার দিয়ে কাটা হয়। অক্ষয় তৃতীয় থেকে শুরু হয়ে পুরো দুই মাস ধরে রথ প্রস্তুত করা হয়। মন্দিরের প্রধান পুরোহিত জঙ্গলে গিয়ে গাছ চিহ্নিত করেন। গাছটিকে পূজা করার পর বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে সোনার কুঠার দিয়ে কেটে নিয়ে রথ তৈরি করা হয়। একটি ছুতোর পরিবার বংশানুক্রমিক রথযাত্রার জন্য গাছ কাটেন। ওই পরিবারের সদস্য প্রথম সোনার কুঠার জগন্নাথ দেবের পায়ে স্পর্শ করেন। তারপর জগন্নাথের আশীর্বাদ নিয়ে গাছ কাটেন। এই প্রথা এখনও চলমান। কিন্তু বগুড়ার রথটি কাঠের পরিবর্তে লোহা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এতেই ঘটেছে বিপত্তি।

এমনটাই বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন বগুড়া পুলিশ লাইনস শিব মন্দিরের প্রধান পুরোহিত পরেশ আচার্য্য। তিনি বলেন, ‌‘শাস্ত্র অনুসারে প্রচণ্ড গরমে শান্তি পেতে জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা তিথিতে ১০৮ কলসি জল ঢেলে স্নান করানো হয় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এরপর জ্বর আসে তিন ভাইবোনের। সর্দি জ্বরের কারণে ১৫ দিন তাদের অন্য একটি কক্ষে আলাদা রাখা হয়। রাজবৈদ্যের দেওয়া পাঁচন খেয়ে তারা সুস্থ হন। এরপর রথে চড়ে মাসির বাড়ি বেড়াতে যান। তাদের এই যাত্রাই রথযাত্রা নামে পরিচিত। সোনার কুঠার দিয়ে রথের জন্য কাঠ কাটা হয়। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই বিধি পালন হয়ে আসছে। রথ নির্মাণ করতে কোনও পেরেক বা কাটা কাঠ ব্যবহার করা যায় না। কাঠ হতে হবে সোজা ও খাঁটি। রথ নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কারিগররা মন্দির চত্বরেই থাকেন। তাদেরও অনেক নিয়ম মেনে চলতে হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণও অর্জুন কাঠের তৈরি রথে চড়ে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছেন। সবকিছু বিবেচনায় রথ কখনও ধাতব বস্তু বা লোহার তৈরি হতে পারে না। দুর্ঘটনার পর আমরা দেখলাম, বগুড়ার রথটি লোহা দিয়ে তৈরি। আবার এর চূড়া হিসেবে লোহার রড ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এর চূড়া বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে এসে এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। মন্দিরের দায়িত্বশীলদের কাছে আমরা এটি কখনও আশা করিনি।’  

যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রথা ভেঙে সেউজগাড়ি শ্রীশ্রী ইসকন মন্দিরের দায়িত্বশীলরা কেন কাঠের পরিবর্তে লোহা দিয়ে রথ তৈরি করেছেন, তা আমরা জানি না বলে উল্লেখ করেছেন শহরের কাটনারপাড়া নারায়ণ বিগ্রহ মন্দিরের সভাপতি চপল কান্তি সাহা। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘রথযাত্রা আয়োজক কমিটির ভুল ও গাফিলতির কারণে মাশুল দিতে হয়েছে আমাদের। দায়িত্বে অবহেলাকারীদের শাস্তির দাবি জানাই।’

সেউজগাড়ি এলাকার বাসিন্দা ওই রথের চালক গোবিন্দ দাস ও শিব পাল বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, রবিবার বিকাল ৫টার দিকে সেউজগাড়ি ইসকন মন্দির থেকে প্রতি বছরের মতো রথযাত্রা শুরু হয়। প্রায় ১৫ হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ অংশ নেন। অনেকে রথের ওপরে ছিলেন। বেশিরভাগ ভক্ত লোহার রথটির রশি টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ২০-২৫ ফুট উচ্চতায় চূড়ার রডটি ওঠানো হয়েছে। রডের সঙ্গে বৈদ্যুতিক তার লেগে হতাহতের ঘটনা ঘটে। আমরাও আহত হয়েছি। কমবেশি শতাধিক ভক্ত আহত হয়েছেন। এরপরও ভক্তরা রশি টেনে রথটি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পুলিশ লাইনস এলাকায় শিব মন্দিরে নিয়ে গেছেন।

দুপুরে বগুড়ার পুলিশ লাইনস শিব মন্দিরে গিয়ে দেখা গেছে, মন্দিরের সামনে রথটি রাখা। এতে কোনও ধরনের কাঠ ব্যবহার হয়নি। পুরোটাই লোহার তৈরি। রথটিতে হাইড্রোলিক ব্রেক ও চূড়া উঁচু-নিচু করার হাইড্রোলিক গিয়ার আছে। মানুষজন দুর্ঘটনাকবলিত রথটি দেখতে সেখানে ভিড় করেছেন।

কাঠের পরিবর্তে লোহা দিয়ে কেন রথ তৈরি করা হয়েছে জানতে চাইলে সেউজগাড়ি শ্রীশ্রী ইসকন মন্দিরের সভাপতি দীলিপ কুমার দেব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ১৮ বছর ধরে লোহার তৈরি রথ ব্যবহার করে আসছি আমরা। সারা দেশে ৩০টির বেশি লোহার রথ আছে। একমাত্র ভারতের পুরীতে এখনও কাঠের রথ ব্যবহার হয়। বাংলাদেশে ২০০৬ সাল থেকে লোহার রথ ব্যবহার হচ্ছে। দায়িত্বরতরা বিদ্যুতের তার দেখে চূড়া নামানোর চেষ্টা করলেও হাইড্রোলিক গিয়ার কাজ করেনি। তারা রথ থামাতে চিৎকার করলেও ভক্তরা শোনেননি। ভক্তরা রশি টেনে নিয়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের তারে লেগে রথের চূড়ায় আগুন ধরে যায়।’ 

চূড়ার উচ্চতা আগেই নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসন থেকে আপনাদের সতর্ক করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে দীলিপ কুমার বলেন, ‘রথ কিংবা চূড়ার উচ্চতা ছোট করার ব্যাপারে প্রশাসন থেকে আমাদের কোনও নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এটি একটি দুর্ঘটনা। দায়িত্বে কারও অবহেলা ছিল না। তবে আগামীতে চূড়াটি কাঠের ও উচ্চতা কম করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।’

দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রথযাত্রা আয়োজক কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অধ্যক্ষ খরাজিতা কৃষ্ণদাস ব্রহ্মচারী বলেন, ‘অতীতে কখনও এ রকম দুর্ঘটনা ঘটেনি। রথযাত্রার সবকিছু দেখভাল করতে কমিটির পক্ষ থেকে ১০০ জন সেবক নিয়োগ ছিলেন। সড়কের ওপর বৈদ্যুতিক তারে যাতে চূড়ার স্পর্শ না লাগে, সেজন্য চূড়া ওঠানো-নামানোর জন্য দুজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দায়িত্বে থাকা অলোক কুমার ঘটনাস্থলেই মারা যান। সুশান্ত দাসের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বগুড়া শজিমেক হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন তিনি। আমরা সতর্ক ছিলাম, দায়িত্বে অবহেলা ছিল না কারও।’

তবে জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‌‘বছরে দুই দফা রথযাত্রা ও উল্টো-রথযাত্রা বের হয়। শহরের রাস্তার ওপরে থাকা বৈদ্যুতিক তারের অবস্থান অনুযায়ী ঠিক কত ফুট উচ্চতায় রথ ওঠানো যাবে, তা নিয়ে আয়োজকদের আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের সেই সতর্কতা সত্ত্বেও ২৫ ফুট উচ্চতায় রথের চূড়া ওঠানো হয়। চূড়া ওঠানো-নামানোর দায়িত্ব ছিল একজনের হাতে। কিন্তু তার ভুলেই ঘটে গেলো মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা। আয়োজকদের ভুলেই এটি ঘটেছে। তাদের সতর্ক থাকা উচিত ছিল।’

হতাহতের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ইসকন মন্দির কমিটির সহসভাপতি ও উত্তরাঞ্চরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ভক্তি বিনয় স্বামী মহারাজ এবং সাধারণ সম্পাদক চারু চন্দ্র দাস ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধি দল সকালে বগুড়ায় আসেন। তাদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার সাত ধর্মীয় নেতা যোগ দেন। তারা বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভক্তদের খোঁজখবর নেন। এ ছাড়া মৃত পাঁচ জনের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে এবং আহতদের ১০-২০ হাজার টাকা করে দেন। একইসঙ্গে আহতদের চিকিৎসা সহায়তার আশ্বাস দেন।

প্রসঙ্গত, রবিবার বিকাল সোয়া ৫টার দিকে শহরের স্টেশন সড়কের সেউজগাড়ি এলাকার আমতলা মোড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়। আহত অবস্থায় ৩৮ জনকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল ও পাঁচ জনকে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আরও পড়ুন: বগুড়ায় রথযাত্রায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ৫ জনের মৃত্যু, আহত ৩৭

আরও পড়ুন: রথযাত্রায় ৫ জনের মৃত্যু: প্রশাসন সতর্ক করলেও শোনেননি আয়োজকরা