বগুড়ায় জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হয়নি মামলা, কবজি বিচ্ছিন্ন মুক্তারের খোঁজে পুলিশ

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ কর্মী সাগর হোসেন তালুকদার (৩৫) ও তার সহযোগী স্বপন (৩২) হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনও মামলা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে থানায় অভিযোগ দেয়নি নিহতদের পরিবার। তবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও রহস্য উদঘাটনে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা মাঠে নেমেছেন।

রবিবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার আশেকপুর ইউনিয়নের সাবরুল ছোট মন্ডলপাড়া এলাকায় এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। নিহত সাগর হোসেন সাবরুল বাজার এলাকার গোলাম মোস্তফা তালুকদারের ছেলে এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের সক্রিয় কর্মী। তার সহযোগী স্বপন সাবরুল তালুকদার পাড়ার সাইফুল ইসলামের ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাসহ অন্তত এক ডজন মামলার আসামি সাগর এবং স্বপনও একাধিক মামলার আসামি। ঘটনার সময় কবজি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া সাগরের অন্যতম সহযোগী মুক্তার হোসেন (২৯) ওই গ্রামের আনসার আলীর ছেলে। ঘটনার পর থেকে পলাতক থাকায় মুক্তারের এখনও সন্ধান পায়নি পুলিশ।

পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দাদের দৃষ্টি এখন সাগরের অন্যতম সহযোগী ও হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তার হোসেনের দিকে। সাগর ও স্বপন হত্যাকাণ্ডের সময় মুক্তার তাদের মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানতে পেরেছে। হত্যাকাণ্ডের পর মুক্তারকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তবে হাসপাতালে মুক্তারের হদিস মিলছে না। ভর্তি রেজিস্টারে এই নামের কোনও রোগীর তথ্য দিতে পারেনি হাসপাতাল প্রশাসন।

বগুড়া ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুস্তাফিজ হাসান জানিয়েছেন, শাজাহানপুরে জোড়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে পুলিশের পাশাপাশি ডিবি ‘ছায়া তদন্ত’ করতে মাঠে নেমেছে। ডিবির কাছে তথ্য আছে, হত্যাকাণ্ডের আগে সাবরুল বাজার থেকে একটি মোটরসাইকেলে চড়ে সাগর তার মাছের খামারে যাচ্ছিলেন। ওই মোটরসাইকেলের চালক ছিলেন মুক্তার হোসেন। তার বাড়িও সাবরুল গ্রামে।

হত্যাকাণ্ডের পর মুক্তারের ভাই মজনু মিঞা দাবি করেছিলেন, হামলায় মুক্তারও গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে মুক্তারকে পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের নথিতে ওই নামে রোগী ভর্তির কোনও তথ্য নেই। হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী কিংবা সাক্ষী হিসেবে মুক্তারের খোঁজ মিলছে না। এখন মজনুও পলাতক।

এ ব্যাপারে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‌ভর্তি রেজিস্টারের তথ্যানুযায়ী, মুক্তার নামে কোনও রোগী গত রবিবার হাসপাতালে ভর্তি হননি।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাবরুল ছোট মন্ডলপাড়া এলাকায় সাগর সহযোগীদের নিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন। পরে সাগর, স্বপন ও মুক্তারসহ কয়েকজন মন্ডলপাড়ার একটি মুরগির খামারের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় কয়েকটি মোটরসাইকেলে আসা একদল দুর্বৃত্ত দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে সাগর ও তার দুই সহযোগীকে উপর্যুপরি কুপিয়ে জখম করে। এতে ঘটনাস্থলেই সাগর ও স্বপন নিহত হন। মুক্তারের ডান হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। 

খবর পেয়ে বগুড়ার পুলিশ সুপার জিদান আল মুসা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুর রশিদসহ জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুর রশিদ বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী সাগর ও তার এক সহযোগী প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হয়েছেন। তবে হামলাকারীদের এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সাগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ এক ডজন মামলা আছে।’

সাবরুল বাজারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় শাজাহানপুর, নন্দীগ্রাম ও কাহালু উপজেলার আশপাশে ৩০ গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন সাগর। সাবরুল বাজারে সাগরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মামা-ভাগনে এন্টারপ্রাইজ কার্যত সন্ত্রাসীদের আখড়া। এক দশক ধরে ওই দোকানে বসে নানা অপকর্মে জড়িয়েছেন। বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা থেকে ব্যবসা সবকিছুতেই চাঁদা দিতে হতো। তার একটি বাহিনী আছে। মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে চলাফেরা করতেন। সড়কে মাছের গাড়ি, যানবাহন থেকে শুরু করে জমি চাষের পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর থেকেও চাঁদাবাজি করতেন।

মন্ডলপাড়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, সাগর একসময় বাসের হেলপারি করতেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতার হাত ধরে রাজনীতিতে নাম লেখান। ১৫-২০ জন সদস্য নিয়ে সাগর বাহিনী গড়ে তোলেন। গত ১৫ বছরে মাদক ব্যবসা, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ করেছেন। গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর সাবরুল বাজার থেকে মোটরসাইকেলে বগুড়া শহরে যাওয়ার পথে মাথাইলচাপড় এলাকায় কলেজশিক্ষক ও আওয়ামী লীগের নেতা শাহজালাল তালুকদার পারভেজকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। কারাগারে থেকে এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ার অভিযোগে সাগর হোসেনের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা হয়। দুটি হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজিসহ সাগর অন্তত ১২টি মামলার আসামি ছিলেন। এরপর শাবরুল বাজারের মাছ ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। বাবু হত্যা মামলায়ও সাগরকে আসামি করা হয়। তার বাহিনীর অত্যাচারে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ ছিলেন। শাবরুলের হরিদেবপুরে এক বড় জলাশয় দখল করে সাগর, স্বপন ও মুক্তার মাছ চাষ করেন। সাগরের বাবাও মাদক ব্যবসায় জড়িত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানিয়েছেন, রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাগর, স্বপন ও মুক্তার পুকুর দেখে শাবরুলের ছোট মন্ডলপাড়া গ্রামে আসেন। সেখানে ১৫-২০ জনের একদল দুর্বৃত্ত তাদের ওপর হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্র দিকে কুপিয়ে সাগর ও স্বপনকে হত্যা করা হয়। এ সময় মুক্তারের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে রাস্তার পাশে ডোবার কাছ থেকে সাগরের ও স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়ির উঠান থেকে স্বপনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া রাস্তায় মুক্তারের বাম হাতের কবজি পড়ে ছিল। খবর পেয়ে পুলিশ এসে দুজনের লাশ ও হাতের কবজি উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার তাদের প্রতিপক্ষ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে ধারণা প্রত্যক্ষদর্শীদের। তবে তাদের মৃত্যুতে এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে।

সাগরের বাবা গোলাম মোস্তফা তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছেলে রবিবার বিকালে পুকুর দেখতে গিয়েছিল। ফেরার পথে ছেলেসহ দুজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আমার ছেলের সঙ্গে কয়েকজনের শত্রুতা ছিল। এর জের ধরেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’

বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুমন রঞ্জন সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মামলা হয়নি। তবে ঘটনাস্থল থেকে মুক্তারের হাতের কবজি উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি কোথায় চিকিৎসা নিচ্ছেন, তা জানা যায়নি। তার খোঁজ মিললে ঘটনা সম্পর্কে জানা যাবে।’

শাজাহানপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। ময়নাতদন্তের পর দুজনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন: বগুড়ায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ কর্মী সাগর ও তার সহযোগীকে কুপিয়ে হত্যা