উচ্চ আদালতের অনুমতির নামে বগুড়ায় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা গত এক বছর ধরে জুয়া ও হাউজি চালাচ্ছে। তারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে শহরের কামারগাড়ি এলাকায় গভীর রাত পর্যন্ত জুয়ার আসর বসিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আয় করছে।
অন্যদিকে দূর-দূরান্ত থেকে আসা জুয়াড়িদের যানবাহনের শব্দ ও তাদের চিৎকারে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ। সন্তানদের লেখাপড়া বিঘ্নিত হওয়াসহ আইন–শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ও এলাকায় চুরি-ছিনতাই বেড়ে যাওয়ায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ। এতে সরকার ও উচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে এই জুয়ার আসর বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
জানা গেছে, বগুড়া শহর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল মান্নান হাউজি ও জুয়ার আসর বসানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট (নং-৩৭৩/২০১৪) করেন। বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. হাবিবুল গণির বেঞ্চ ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তিন বছরের জন্য ইনডোর গেম (১-১০, ১-৮, চুড়চুড়ি ও ডাইস) পরিচালনার অনুমতি দেন। এছাড়া আয়োজকদের কেউ যাতে হয়রানি না করতে পারে সে ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা শেষ হওয়ার পর গত বছরের এপ্রিল থেকে শহরের নুরানী মোড় কামারগাড়ি এলাকায় হাউজি, স্যুটিংসহ বিভিন্ন ধরনের জুয়ার আসরের আয়োজন করা হয়। এসব পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিকলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের প্রভাবশালী নেতারা। সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এলাকা আলোকিত করা হয়। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাউজি ও জুয়া চলে। আয়োজকরা এখান থেকে উপার্জিত টাকার একটি ভাগ পুলিশ ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে দিয়ে থাকেন।
জুয়ার আসরকে কেন্দ্র করে এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা জমজমাট ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে। দেদারসে বিক্রি হচ্ছে ফেনসিডিল ও ইয়াবা। ক্ষমতাসীন দলের এসব মাদক ব্যবসায়ীরা মাঝে মাঝে গ্রেফতার হলেও তাদের হাজতে রাখা সম্ভব হয় না। ২-৩ দিন পরই তারা জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার মাদক ব্যবসায় নামছে।
জুয়ার আসরের নৈশ প্রহরী জাহিদুল মুন্সী জানান, তিনি মাসে ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছেন। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাউজি ও বিভিন্ন ধরনের জুয়া চলে। সোমবার ও বৃহস্পতিবার রাতে বাম্পার হাউজি হয়। পালসার মোটরসাইকেলসহ মূল্যবান পুরস্কার থাকে ওই দিনগুলোতে। এ কারণে রাতে প্রচণ্ড ভিড় হয়ে থাকে।
হাউজি ও জুয়ার আয়োজক বগুড়া শহর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল মান্নান জানান, হাইকোর্টে রিট করে তিনি তিন বছরের জন্য ১-১০ (স্যুটিং), ১-৮, চুড়চুড়ি ও ডাইস খেলা পরিচালনার অনুমতি পেয়েছেন। আগামী ডিসেম্বরে এর মেয়াদ শেষ হবে। শহর যুবলীগ নেতা আবদুল মতিন সরকারসহ তার কয়েকজন পার্টনার রয়েছে। তিনি এ জুয়া বন্ধ করতে চাইলেও পার্টনাররা বিরোধিতা করায় তিনি বন্ধ করতে পারছেন না।
তিনি আরও জানান, এখানে উপার্জিত টাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও দুঃস্থদের সহযোগিতা করে থাকেন। বিভিন্ন মহল ছাড়াও পুলিশ প্রশাসনকে প্রতি রাতে ১০ হাজার টাকা করে দিতে হয়। যে কোনও প্রয়োজনে পুলিশ এই জুয়ার আসর থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে থাকে। প্রতিরাতে খরচ বাদে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হয়। তা থেকে তিনি ১০-১২ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন।
এ আয়ের কোনও বরকত নেই বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই ব্যবসার কারণে তার সামাজিক ও পারিবারিক মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে। তার হালাল ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এই জুয়ার আসরের কারণে আশপাশের মানুষ নিরাপত্তা পাচ্ছেন। এলাকার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ভালো আছে। তারা বিদ্যুৎ নিয়মিত বিল পরিশোধ করেন বলে দাবি করেন।
বগুড়া সদর থানার ওসি আবুল বাশার জানান, উচ্চ আদালতের অনুমতি থাকায় তারা ওই জুয়ার আসরে কোনও নজরদারি করেন না। তবে প্রতিরাতে চাঁদার বখরা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, জুয়ারি আসর থেকে পুলিশ কোনও আর্থিক সুবিধা নেয় না।
/জেবি/টিএন/