বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় যমুনা নদী থেকে অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। ড্রেজার মেশিন ও ভেকু মেশিনের মাধ্যমে নদীর বুক চিরে প্রকাশ্যে বালু তোলা হয়। মাঝেমধ্যে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে লাখ টাকা জরিমানা ও সরঞ্জামাদি জব্দ করলেও থামানো যাচ্ছে না অবৈধ বালু উত্তোলন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সারিয়াকান্দি উপজেলার কর্ণিবাড়ী, হাটশেরপুর, কাজলা, চরকুমারপাড়া, দেবডাঙ্গা, কুতুবপুর, ধলিকান্দি, চন্দনবাইশার রৌহদহ, আদবাড়িয়া, চর চন্দনবাইশা, দেলুয়াবাড়ি, ইছামারা ও গজারিয়া পয়েন্ট থেকে প্রতিনিয়ত বালু তোলা হচ্ছে। কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের নারাপালা ও বোহাইল ইউনিয়নের কালিয়ান মহাল জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা দেওয়া হয়। তবে এক স্থান থেকে বালু তোলার অনুমতি (ইজারা) নিয়ে অবৈধভাবে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রতিনিয়ত যমুনার বালু তুলে নিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালীরা।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে যমুনা নদীর বৈধ-অবৈধ বালুর ব্যবসা আওয়ামী লীগ নেতারা নিয়ন্ত্রণ করলেও এখন বিএনপির নেতা পরিচয়ে এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বর্তমানে সোনাতলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহসানুল তৈয়ব জাকিরের মদতে গোপনে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে বালু তোলা হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নারাপালা বালুমহালটি কয়েক বছর আগে ইজারা নেন সারিয়াকান্দি উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আইয়ুব আলী তরফদার ও সারিয়াকান্দি পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুস সালাম। এরপর বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে বালুমহলটি ইজারা নেন হাটশেরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইফাজ উদ্দিন, কালিয়ান বালুমহালটি ইজারা নিতেন জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সারিয়াকান্দির কামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদুজ্জামান রাসেল। দলটির এই কয়েকজন মূলত সারিয়াকান্দি উপজেলায় বৈধ ও অবৈধ বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নেতারা আত্মগোপনে গেলে বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও স্বেচ্ছাসেবকদল থেকে বহিষ্কৃত নেতা আনোয়ার হোসেন দীপন, কাজলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সারিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম, বগুড়া জেলা যুবদল নেতা আতাউর রহমান, উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মহিদুল ইসলাম, যুবদল কর্মী বাঁধনসহ অনেকে।
তবে তাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখে বালুমহল পরিচালনা করছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের স্থানীয় নেতারা। তাদের মধ্যে হাটশেরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইফাজ উদ্দিন, সারিয়াকান্দি যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আশিক, কাজলা যুবলীগ নেতা শাকিল, সিরাজুল, শাহাদত, স্বাধীন সম্পৃক্ত আছেন।
অবশ্য এসব কথা স্বীকার করেছেন কাজলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সারিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বালুমহলের টাকা ২০০ ভাগ করে আমাকে এক ভাগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। আমি বলেছি, এসবের মধ্যে নেই। আওয়ামী লীগ নেতাদের বালু ব্যবসার কাজে এখন সহযোগিতা করছেন বিএনপির নেতারা। কর্ণিবাড়ী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান দীপন, বিএনপি নেতা ইসহাকসহ অন্যরা এসবে জড়িত। তারা মিটিং করেছে, আমাকে ডেকেছে, আমি বলেছি এসব অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে আমি নেই।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সোনাতলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহসানুল তৈয়ব জাকির। তিনি বলেন, ‘আমি এক উপজেলায় বসবাস করি, বালু ব্যবসার ঘটনা অন্য উপজেলায়। কাজেই বালুমহলে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। কারা এসব করছে, আমি জানি না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বালু তুলে ট্রাক ও ট্রলারে করে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে অনেক জায়গায় নদীর পাড় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে যমুনার স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত হচ্ছে এবং নদীর তীরে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে ফসলের জমি, বসতভিটা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার মুখে পড়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে নির্বিচারে বালু উত্তোলন নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে। মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং নদীর গভীরতা ও প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দা ইশরাত হাসান বলেন, বালু উত্তোলন হলে নদীর যে ইকোসিস্টেম সেটা নষ্ট হচ্ছে। নদীভাঙন বাড়ছে, যার প্রাভাব পড়ছে মানুষের ওপর। হয়তো একটা গোষ্ঠী সাময়িক লাভবান হচ্ছে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে আমরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এগুলো হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। এসব নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
তবে ইজারাদার ব্যতীত এবং নির্দিষ্ট জায়গা (পয়েন্ট) ছাড়া অন্য স্থান থেকে বালু উত্তোলনকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া ফেরদৌস।
নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। বেশ কয়েকটি অভিযানে জরিমানা করা হয়েছে। কেউ অবৈধভাবে বালু তুললে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমাদের অভিযান চলমান আছে।’