দেড় মাসে জলে গেলো ৫২৭ কোটি, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন

সুমিত সরকার সুমন, মুন্সীগঞ্জ
২১ জুলাই ২০২৬, ১০:০১ আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ১০:০১

পদ্মার ভয়াল ভাঙন থেকে স্থায়ী সুরক্ষার আশায় ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধ। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার দেড় মাসের মধ্যেই সেই বাঁধের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে প্রকল্পের কাজের মান ও তদারকি নিয়েও দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।

গত ১২ জুলাই বিকালে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া এলাকায় নবনির্মিত স্থায়ী বাঁধের প্রায় ২০ মিটার অংশ ধসে পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 

স্থানীয় বাসিন্দা আবু সালাম মোল্লা অভিযোগ করেন, ‘কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি স্থায়ী বাঁধ এত অল্প সময়ে ধসে পড়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। নির্মাণকাজে বড় ধরনের দুর্বলতা ও ত্রুটি ছিল। তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এখানে অবশ্যই দুর্নীতি হয়েছে।’

স্থানীয় লোকজন বলছেন, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে সামনে নদীর পানি ও স্রোত আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙনকবলিত অংশে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, সাময়িক নয়, স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। না হয় ঝুঁকি আরও বাড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবু হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই বাঁধ হওয়ার পর আমরা ভেবেছিলাম আর হয়তো ঘরবাড়ি হারাতে হবে না। কিন্তু দেড় মাস যেতে না যেতেই বাঁধ ভেঙে গেলো। এখন আগের চেয়েও বেশি ভয় লাগছে। শুধু জরুরি ভিত্তিতে ব্লক বসালেই হবে না; বাঁধের নকশা, নির্মাণকাজের মান এবং ব্যবহৃত উপকরণের গুণগত বিষয়ও যাচাই করতে হবে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গাঁওদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আশপাশের চারটি মাদ্রাসা, বাজারসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।’

পদ্মার ভয়াল ভাঙন থেকে স্থায়ী সুরক্ষার আশায় ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধ

নদীর তীরের বাসিন্দা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘গত রবিবার বিকালে গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাঁওদিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে নদী তীর রক্ষা বাঁধে হঠাৎ ধস দেখা দেয়। প্রথমে কয়েকটি সিসি ব্লক সরে গেলেও পরে দ্রুত বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। কোনও ধরনের বড় শব্দ ছাড়াই বাঁধের ব্লকগুলো পদ্মার স্রোতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারগুলো ভয়ে ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে থাকেন।’

নদীর তীরে বসবসরত শাহিদা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এভাবে বাঁধ ভেঙে যাবে আমরা ভাবতেই পারিনি। কয়েকবার পদ্মার ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে নদীর তীরে ছিলাম। এখন এভাবে ভাঙছে, কখন যে কী হয় আমরা বুঝতে পারছি না। আমার ছেলেমেয়ে নেই। স্বামী-স্ত্রী দুজনে কৃষিকাজ করে কোনও রকম জীবন পার করছি। রাতে ঘুম হয় না কখন আবার ভেঙে যায়। এই ঘর ভেঙে অন্য কোথাও নিয়ে যাবো সেই টাকাও নেই। সরকারের কাছে দাবি আমাদের এই বাঁধটা যেন ভালোমতো করে দেয়। আমরা এখানেই থাকতে চাই।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিমাপ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম চলছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। আমরা সার্ভে করেও দেখেছি আগে চিত্র ছিল যেটা বর্তমানে এখন অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। এই প্যাকেজটি হচ্ছে রানিং। ঠিকাদারের কাজ এখনও শেষ হয়নি। আমরা এখন জিও ব্যাগ ডাম্পিং, ব্লক ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। চেষ্টা করা হচ্ছে যেন পরবর্তীতে কোনও ক্ষয়ক্ষতি আর না হয়।’ 

নিম্নমানের কাজ হয়েছে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটা অনেকেই বলতে পারে, আমাদের একটি টিম থাকে। যাকে টাস্কফোর্স বলে। সেটা আমরা জিও ব্যাগ বলি বা ব্লক বলি, এগুলো সবকিছু যখন নির্মাণ করা হয়, টাস্কফোর্স সদস্যরা এসে চেক করে যান। চেক করার পরে তারা যখন শিওর করেন, তখন আমরা সেটা ডাম্পিং করি। আপাতত যেহেতু বন্যাকালীন সময় পানি বাড়তেছে দ্রুত, ভাঙন যেন আর বৃদ্ধি না পায়, এই কারণে সাময়িকভাবে এটার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে আবার আগের মতো কাজ করা হবে। আমরা সার্ভে করছি, পুরোটাই সার্ভে করে দেখবো কোথায় কী রকম অবস্থায় আছে।’

কাজের মান ও তদারকি নিয়েও দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রহমান কনস্ট্রাকশনের সাইট ইঞ্জিনিয়ার ছানাউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদ্মায় পানি বৃদ্ধি এবং তীব্র স্রোতের কারণে নদী তীরের নিচের মাটি সরে গেছে। এ কারণে ধসে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জিও ব্যাগ ফেলে কাজ চলছে। তবে আমাদের কাজের কোনও ঘাটতি নেই। কোয়ালিটি মেনেই কাজ চলমান আছে।’

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ যদি প্রথম বড় স্রোতই সামাল দিতে না পারে তাহলে প্রকল্পের নকশা, নির্মাণমান ও তদারকির মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন ভয়ের আর কোনও কারণ নেই। খবর পাওয়ার পর থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিমাপ করে ভাঙন প্রতিরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পদ্মায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় স্রোতের তীব্রতা কয়েকগুণ বেড়েছে। নদীতীরের মাটি সরে যাওয়ায় ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। আপাতত জিওব্যাগ ফেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তবে স্থায়ী বাঁধের নির্মাণমান বা নির্মাণকাজে কোনও ত্রুটি ছিল কিনা এ বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

/এএম/ 
সম্পর্কিত
ঘরহারা দুই শতাধিক পরিবার
পদ্মা ব্যারাজ থেকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, প্রধানমন্ত্রীর কাছে যত প্রত্যাশা রাজশাহীবাসীর
ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ ৫ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে, বদলিই কি একমাত্র শাস্তি?
সর্বশেষ খবর
মঙ্গলের ‘চাঁদ’ থেকে গুঁড়ো পাথর আনতে জাপানের ঐতিহাসিক অভিযান
মঙ্গলের ‘চাঁদ’ থেকে গুঁড়ো পাথর আনতে জাপানের ঐতিহাসিক অভিযান
দুপুরে রাজশাহী আসছেন প্রধানমন্ত্রী, নজরদারিতে ৪০০ ক্যামেরা
দুপুরে রাজশাহী আসছেন প্রধানমন্ত্রী, নজরদারিতে ৪০০ ক্যামেরা
রাত জাগা ও রিল দেখার অভ্যাসে বাড়ছে অসুস্থতার ঝুঁকি
রাত জাগা ও রিল দেখার অভ্যাসে বাড়ছে অসুস্থতার ঝুঁকি
চাকচিক্যময় উন্নয়ন বনাম নগরে মানুষের দৈনন্দিন স্বস্তি 
চাকচিক্যময় উন্নয়ন বনাম নগরে মানুষের দৈনন্দিন স্বস্তি 
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন