ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের নিয়ে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নীলফামারী অভিমুখী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি বগুড়ার আদমদীঘিতে লাইনচ্যুত হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এরই মধ্যে তিনটি স্টেশনে আটকা পড়েছে অন্তত পাঁচটি ট্রেন। বুধবার (১৮ মার্চ) রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত নয় ঘণ্টায়ও উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। অনেকে বিভিন্ন যানবাহনে গন্তব্যে গেছেন।
সান্তাহার জংশন স্টেশন ও রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় তিনটি স্টেশনে ঈদযাত্রার ৫টি ট্রেন আটকা পড়েছে। আজ রাত ২টা নাগাদ লাইনচ্যুত ট্রেনটি উদ্ধার হবে। এতে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের আরও কয়েক জোড়া ট্রেন আটকা পড়তে পারে। ঘটনার পর উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ঈশ্বরদী ও পাকশি থেকে আসা রিলিফ ট্রেন দুর্ঘটনাকবলিত নীলসাগর এক্সপ্রেসের নয়টি বগি উদ্ধারে কাজ করছে। রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি। এ ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলায় সান্তাহার জংশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার শহিদুল ইসলাম রঞ্জুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সান্তাহার রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার খাদিজা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রেললাইনের ওই অংশে আগে থেকেই ত্রুটি ছিল। নীলসাগর এক্সপ্রেস বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে সান্তাহারের অদূরে বাগবাড়ি এলাকায় লাইনচ্যুত হয়। ট্রেনের শেষের দিকে থাকা নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়। অনেকে আহত হয়েছেন।’
তিনটি স্টেশনে আটকা পড়েছে অন্তত পাঁচটি ট্রেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘খুলনা থেকে ছেড়ে আসা রূপসা এক্সপ্রেস সান্তাহারে, পঞ্চগড় থেকে ছেড়ে আসা বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস জয়পুরহাট স্টেশনে, রাজশাহী ছেড়ে আসা বরেন্দ্র এক্সপ্রেস সান্তাহার জংশনে আটকে পড়েছে। এ ছাড়া ঢাকা ছেড়ে আসা একতা এক্সপ্রেস
সান্তাহার জংশনে আটকে আছে। এতে ঈদে ঘরে ফেরা যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আজ রাত ২টা নাগাদ লাইনচ্যুত ট্রেনটি উদ্ধার হবে।
তিনি বলেন, ‘তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ বলা সম্ভব নয়। তবে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সহকারী স্টেশন মাস্টার শহিদুল ইসলাম রঞ্জুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। দুর্ঘটনার পর থেকে ট্রেনের চালক পলাতক রয়েছেন।’
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজিব কায়সার বলেন, ‘লাইনচ্যুত ট্রেনটি উদ্ধার করতে রাত ২টা বাজতে পারে। এতে আরও কয়েক জোড়া ট্রেন আটকা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দ্রুত লাইন চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।’
সান্তাহার রেলওয়ে থানার এসআই মাহফুজুর রহমান জানান, ঢাকা ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস বেলা আড়াইটার দিকে সান্তাহার স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে। স্টেশন ছাড়ার কিছুক্ষণ পর বাগবাড়ি এলাকায় ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। সেখানে লাইন মেরামত কাজ চলমান থাকায় ওয়েম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা লাল ব্যানার টানিয়ে ছিলেন। স্টেশন থেকে ট্রেনের চালককে গতি নিয়ন্ত্রণ করতে বার্তাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ট্রেনের চালক খেয়াল না করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।’
চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুৎ হওয়ার ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ হোসেন মাসুম জানান, কমিটিতে রেলওয়ের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, চিফ সিগন্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টকে রাখা হয়েছে।
ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সিগন্যাল নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। লোকো মাস্টার হয়তো সিগন্যাল পাননি বা প্রোপারলি ফলো করেননি। তবে তদন্ত শেষ হলেই প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। পাবনার ঈশ্বরদী ও দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে দুটি রিলিফ ট্রেন দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। ইফতারের পরপরই রিলিফ ট্রেন কাজ শুরু করেছে। তবে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি। আজ রাতের মধ্যে লাইন সচল ও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।’
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে ও নিরাপত্তার জন্য জেলা পুলিশ সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত সময়ের মধ্যেই লাইন সচল হবে। রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সান্তাহারসহ বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়া যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। বগিগুলো সরিয়ে রেল চলাচল স্বাভাবিক করার কাজ চলছে।’