পাবনায় চরমপন্থিদের পোস্টার, স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক

পাবনায় এক দশকেরও বেশি সময় পর নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) দেয়াল লিখন ও পোস্টার দেখা গেছে। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর এ ধরনের তৎপরতা চরমপন্থি সংগঠনের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন।

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, ঈদের দিন রাতে আতাইকুলা থানা এলাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টার সাঁটানো হয়। পোস্টারে সর্বহারার সমাজতন্ত্র কায়েমের পাশাপাশি স্থানীয় তাঁত শিল্প রক্ষার কথা বলা হয়েছে। রবিবার সকাল থেকে একদন্ত, লক্ষ্মীপুর, বৃহস্পতিপুর, ভুলবাড়িয়া, তেবাড়িয়া, শ্রীপুর, শিবপুর, শরৎগঞ্জ, ধানুয়াটা, বালুঘাটা, আয়েনগঞ্জ, হাদল, ধূলাউরীসহ বিভিন্ন বাজারে এই পোস্টার দেখা যায়।

সরেজমিনে আতাইকুলা থানা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, থানা এলাকার বিভিন্ন দোকান, দেয়াল ও জনসমাগমস্থলে লাল রঙের এসব পোস্টার সাঁটানো হয়। পোস্টারে ‌‘দুনিয়ার সর্বহারা এক হও’ স্লোগানের পাশাপাশি সাম্যবাদী আদর্শ প্রচারের বিভিন্ন বার্তা দেওয়া হয়েছে। এতে কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন, জোসেফ স্ট্যালিন এবং মাও সেতুংয়ের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। 

পোস্টারগুলোতে ‘বন্দুকের নল থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা বেরিয়ে আসে’, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো সমাজতন্ত্র কায়েম করো’, ‘লাঙ্গল যার জমি তার, জাল যার জলা তার’, ‘বিদেশি কাপড় বন্ধ করো, তাঁত শিল্প রক্ষা করো’, ‘রং সুতার অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করো, করতে হবে’ এমন ধরনের উসকানিমূলক লেখা রয়েছে। পোস্টারের নিচে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) নাম উল্লেখ রয়েছে। এই সংগঠন অতীতে চরমপন্থি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, রাতের আঁধারে এসব পোস্টার লাগানো হয়েছে। সকালে উঠে এগুলো দেখার পর থেকেই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পুরোনো রক্তক্ষয়ের দিনের কথা মনে করে তারা আতঙ্কিত।

একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘আগে সকালে ঘুম থেকে উঠেই মার্ডারের খবর শুনতে হতো। ওই দিন আর চাই না আমরা।’

সংগঠনটির এক কর্মী বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণেই তারা আবারও সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।’

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অনেক বছর ধরে এলাকায় তাদের তৎপরতা ছিল না। হঠাৎ পোস্টার লাগানো ঘিরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, গোপনে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে এই সংগঠনের কারণে এলাকায় শান্তি ছিল না। চাঁদাবাজি, হত্যা, অপহরণ সব কিছু ছিল দৈনন্দিন ঘটনা। মেয়েদের বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেক বছর ভালো ছিলাম, শান্তিতে ছিলাম। হঠাৎ এই পোস্টার দেখে আবার রাতে ঘুম হচ্ছে না। আবার কী সেই দিন ফিরে আসবে? আবার কী আমাদের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে; এসব ভেবে আতঙ্কে আছি।’

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিপুল সংখ্যক সদস্য আত্মসমর্পণ করায় সংগঠনটি প্রায় নেতৃত্বশূন্য ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল।

দলের আত্মসমর্পণ করা এক কর্মী বলছিলেন, ‘আমরা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছি। স্বাভাবিক কাজকর্ম করে চলছি। আর ওই অন্ধকার জগতে ফিরতে চাই না। ওই সময়ে সরকারের দেওয়া আর্থিক সহায়তায় আমরা বর্তমানে ভালো আছি।’

এ বিষয়ে আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামিরুল ইসলাম বলেন, ‘পোস্টারিংয়ের খবর পাওয়ার পর আমি থানা পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। নমুনা সংগ্রহ করেছি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো কোনও অপতৎপরতা বরদাশত করা হবে না। কারা এই পোস্টারিংয়ের সঙ্গে জড়িত, তা শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করছেন। তারা আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেখতে চান না।’ তাদের সম্পর্কে কারও কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে পুলিশকে দিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়েছেন ওসি।

পাবনার পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে যারা পোস্টার লাগিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’