জৌলুশ হারিয়েছে ‘মহারাজপুর মেলা’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মহারাজপুর মেলা কালের বিবর্তনে এবং অব্যবস্থাপনার কারণে জৌলুস হারিয়েছে। শহরের অদূরে প্রায় ২০০ বছর আগে মহারাজপুরের মিয়া-চৌধুরীরা শুরু করেছিলেন এই মেলার আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী মেলাটি একসময় সাড়ম্বরে উদযাপিত হলেও বর্তমানে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে মূল আকর্ষণ ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব হারিয়েছে। দিন দিন লোকজনও কম আসছেন।

এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে মহারাজপুরের একটি আমবাগানে প্রথম ঈদমেলার আয়োজন করা হয়। সেই থেকে সেখানে মেলা বসছে। মূলত এটি ছিল আবহমান গ্রামবাংলার মেলা বলতে যা বোঝায়, সেসব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। কাঠের আসবাব, বিভিন্ন তৈজসপত্র, মিঠাই-মন্ডা, চুড়ি-ফিতা, ইমিটেশনের গহনা, খেলনা, সার্কাস, পুতুলনাচ, যাত্রাসহ সব আয়োজনই থাকতো। মেলার সময় আত্মীয়-স্বজনকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করতো মহারাজপুরবাসী। ঈদের দিন শুরু হতো বলে ছোটদের বড়রা মেলায় কেনাকাটার জন্য টাকা দিতেন (যা এখানে মেলা দেখার টাকা নামে জানে সবাই) এটাই ছিল রীতি। বাড়িতে নতুন জামাইরা আসতেন, মেয়ের সংসারের জন্য মেলা থেকে কেনা হতো ফার্নিচার। মহা আনন্দে কাঁটতো কয়েকটি দিন। কিন্তু এই সুখ স্মৃতি অনেকের কাছে এখন শুধুই স্মৃতি। এখন আর মেলা হচ্ছে না। একটু একটু করে কলুষিত হয়েছে। তবে অনেকেই বলছেন, ১৯৯৬ সাল থেকে ইউনিয়ন পরিষদের নিয়ন্ত্রণে মেলা হওয়ার পর থেকেই অশ্লীলতা ছড়িয়েছে। এজন্য জৌলুস হারিয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। ভারত উপমহাদেশ বিভাগের আগে এটি মালদহ জেলার একটি অংশ ছিল। অনেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকে আমের শহর বা আমের দেশ বলেও জানে। জেলায় দেশের আমের একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয়। যার ফলে একে আমের রাজধানী বলা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রত্মসম্পদে সমৃদ্ধ একটি জেলা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘেরিয়া এলাকায় ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা ‘বাইশ পুতুল’ মন্দিরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সমাগম থেকেই মূলত এই মেলার সূচনা হয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে এটি পরিণত হয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও গ্রামীণ সংস্কৃতির মিলনমেলায়।

তবে ঠিক কার হাত ধরে পূজার সূচনা হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট কোনও ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে জনশ্রুতি আছে, প্রায় ৩০০ বছর আগে গোমস্তাপুর উপজেলার শুক্রবাড়ি গ্রামে ‘বাইশ পুতুল’ দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। একসময় কোনও অজানা কারণে পূজার কাঠামো মহানন্দা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পরে সেটি ভেসে এসে পৌঁছায় বারঘেরিয়া এলাকায়।

শহরের অদূরে প্রায় ২০০ বছর আগে মহারাজপুরের মিয়া-চৌধুরীরা শুরু করেছিলেন এই মেলার আয়োজন

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ও সাবেক পূজা উদযাপন কমিটির কোষাধ্যক্ষ বাসুদেব চন্দ্রপাল এবং প্রভাস কুমার সাহা জানান, পরে স্বপ্নে নির্দেশ পেয়ে শুক্রবাড়ির লোকজন বারঘেরিয়ায় এসে জমি ক্রয় করে পূজার আয়োজন শুরু করেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজও সেখানে ‘বাইশ পুতুল’ দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পূজাকে ঘিরে বাড়তে থাকে মানুষের সমাগম এবং শুরু হয় মেলার কার্যক্রম। পরে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় দেশ ভাগের আগেই স্থানীয় মরহুম সদর আহমেদ মিয়া মহারাজপুর এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী আমবাগানে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য আলাদাভাবে মেলার আয়োজন শুরু করেন। পরবর্তীতে এই মেলা ঈদুল ফিতরের পর অনুষ্ঠিত হওয়ার রেওয়াজ চালু হয়, যা এখনও বজায় রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রানীহাটি এলাকার গণমাধ্যকর্মী মো. সাজেদুল হক সাজু বলেন, ‘২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মেলা ঘুরে দেখা গেছে, এটি শুধুমাত্র কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের একটি প্রাণবন্ত চিত্র। মেলার বিভিন্ন প্রান্তে মেয়েদের সাজসজ্জার সামগ্রী, খই, বাতাসা, গুড়সহ নানা পণ্য নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। উৎসবমুখর পরিবেশে জমে ওঠে বেচাকেনা। বিশেষ করে কাঠের পুতুলের দোকানগুলো শিশুদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এ ছাড়া বাঁশ ও বেতের তৈরি ঝুড়ি, চালুনি ও কৃষি উপকরণও পাওয়া যায়, যা গ্রামীণ জীবনে এখনও প্রয়োজনীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।’

মেলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো কুমারদের দোকান। সেখানে হাঁড়ি, কলস, থালা থেকে শুরু করে নানা মাটির খেলনা বিক্রি হয়, যা স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি বহন করে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির পেছনের খালি জায়গাতেও ছোট ছোট দোকান বসে, যা মেলার বিস্তৃত পরিসরকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

স্থানীয়দের লোকজনের ভাষ্যমতে, এই মেলা শুধু ধর্মীয় আচার বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি বহু বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতিফলন। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণে এই মেলা এলাকার সামগ্রিক সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সদর উপজেলার মহারাজপুরের ঐতিহ্যবাহী ঈদমেলা এখন জুয়ার আসরে পরিণত হয়েছে। কিন্তু জুয়া বন্ধে উদ্যোগী নন কেউই। এত পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এই মেলাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী মেলাকে দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক আকর্ষণে পরিণত করা সম্ভব।