নওগাঁয় এক পরিবারের চার জনকে হত্যা করলো কারা?

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় এক দম্পতি ও তার দুই ছেলেমেয়েকে হত্যার পেছনে জমিজমা নিয়ে বিরোধ ও পূর্ব শত্রুতা রয়েছে বলে ধারণা করছেন স্বজন, স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নিহতের ভাগনে সবুজ হোসেনকে (২৫) আটক করেছে পুলিশ। তবে এখনও মামলা হয়নি।

মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাহাদুরপুর গ্রাম থেকে তাকে আটক করা হয়। আটক সবুজ হোসেন নিহত হাবিবুর রহমানের ভাগনে এবং মান্দা উপজেলার পারনপুর গ্রামের আব্দুস সামাদের ছেলে।

এর আগে সোমবার মধ্যরাতে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে হাবিবুর রহমানসহ (৩৫) তার পরিবারের চার জনকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যাকাণ্ডের শিকার অন্য তিন জন হলেন, হাবিবুর রহমানের স্ত্রী পপি সুলতানা (৩০), তার ছেলে পারভেজ রহমান (৯) ও মেয়ে সাদিয়া খাতুন (৩)। আজ সকালে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। 

স্থানীয় লোকজন ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার রাতের কোনও একসময় বাড়ির ভেতরেই পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ফজরের নামাজের পর দরজা খোলা দেখে প্রতিবেশীরা ভেতরে ঢুকলে তাদের মরদেহ দেখতে পান। থানায় খবর দিলে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

হাবিবুর রহমান গরু ব্যবসায়ী ছিলেন। মান্দার চৌবাড়িয়া হাটে গরু বিক্রি করে সোমবার রাত ৮টার দিকে বাড়িতে আসেন। তার কাছে গরু বিক্রি করার ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ছিল। পুলিশ ও প্রতিবেশীরা ধারণা করছেন, দুর্বৃত্তরা হাবিবুরের টাকা লুটের জন্য তাকে ও পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছে। এ ছাড়া জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলেও ধারণা করছেন তারা।

বাহাদুরপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের মরদেহ বাড়ির আঙিনায় ঢেকে রাখা হয়েছে। নিহত পপি সুলতানার মা সাবিনা বেগম মেয়ে, জামাতা ও দুই নাতি-নাতনির মরদেহের পাশা আহাজারি করছেন।

আহাজারি করতে করতে সাবিনা বেগম বলেন,  ‘১৩-১৪ বছর আগে মেয়ের বিয়ে হয়। বিয়ে হওয়ার পর থেকে ননদরা মেয়ের সংসারে অশান্তি শুরু করে। এক বাচ্চা হওয়ার পর মেয়ে যখন বেড়াতে যায়, তখন মেয়েকে তালাক পাঠায়। বোনেরা মিলে গন্ডগোল করে; কিন্তু আমার জামাইয়ের একই কথা, ‌আমি নেবো, সংসার করবো। জামাইয়ের ওপর ভরসা করে মেয়েকে আবারও পাঠাই। মেয়েকে তারা বহুদিন থেকে নির্যাতন করতেছে। জমির ভাগাভাগি নিয়ে ওরা পাঁচ বোন মিলেই মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনিকে মেরে ফেলছে।’

হত্যার পেছনে জমিজমা নিয়ে বিরোধ ও পূর্বশত্রুতা রয়েছে বলে ধারণা করছেন স্বজন, স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ

পপির বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, ‘আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবার ফাঁসি চাই। আমার তিন বছরের নাতনিকেও তারা ছাড়েনি। বাড়ির জমিজমা নিয়ে বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।’

নিহত হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিন বলেন, ‘জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। আমার মেয়ে, মেয়ের জামাই ও নাতিরা এ ঘটনায় জড়িত থাকতেও পারে। তারা বিভিন্ন সময়ে আমার ছেলেসহ পরিবারের সবাইকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করলে আসল রহস্য জানা যাবে।’

নমির উদ্দিন বলেন, ‘আমার ছেলে, বউমা আর দুই নাতি-নাতনি রাতে একই ঘরে ঘুমাইছিল। আমি অন্য ঘুরে ঘুমাইছিলাম। কখন তাদের মাইরে গেছে, আমি কিছুই জানতে পারিনি। সকালে বাড়ির বাইরের দরজা খোলা দেখে এক প্রতিবেশী বাড়িত ঢুকে প্রথমে আঙিনায় বউমার লাশ দেখে চিৎকার করে ওঠে। তার চিৎকার শুনে আমার ঘুম ভাঙে। উঠে দেখি, আঙিনায় বউমার রক্তাক্ত লাশ। আর ঘরের ভেতর ছেলে ও নাতি-নাতনির লাশ। আমার ছেলে ও তার পরিবারকে শেষ করে দিছে। এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই আমি।’

নিয়ামতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নিহতদের প্রত্যেকের মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মাথায় আঘাত করার পর হাবিবুর ও দুই সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। হাবিবুরের স্ত্রী দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বাড়ির আঙিনায় মাথায় আঘাত ও গলা কেটে তাকে হত্যা করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো নওগাঁ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।’

ওসি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুরের ভাগনে সবুজ হোসেনকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পূর্বশত্রুতার জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে ধারণা করছে পুলিশ। ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের সবাইকে আটক করা হবে।’

নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার প্রক্রিয়া চলছে। সেইসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ), জেলা গোয়েন্দা শাখা এবং নিয়ামতপুর থানা পুলিশের সমন্বয়ে তিনটি পৃথক দল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে।’