দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং শিল্পায়নের স্থবিরতার কারণে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি পাবনা। তবে এবার জেলার উন্নয়নে একযোগে বেশ কয়েকটি বড় উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, কৃষক ও উন্নয়নসংশ্লিষ্টরা।
প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চালুর ঘোষণা, কাজিরহাট-খায়েরচর ফেরিঘাট স্থানান্তরের উদ্যোগ, সম্ভাব্য ওয়াই (Y) টাইপ সেতু নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সম্প্রসারণসহ একাধিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জেলার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
২২ প্রকল্পে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার উদ্যোগ
জানা গেছে, অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের ধারাবাহিক উদ্যোগে জেলার জন্য ছোট-বড় মিলিয়ে ২২টি উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা ও অবকাঠামোগত চাহিদা তুলে ধরে এমপি শিমুল বিশ্বাস সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক ও দাপ্তরিক যোগাযোগ করেছেন। এ পর্যন্ত তিনি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অন্তত নয়বার বৈঠক ও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের মতে, পাবনা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে দ্রুত বিকশিত হলেও সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর কিছু সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত করে আসছিল। বিশেষ করে জেলা সদর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও সুজানগরসহ বিভিন্ন উপজেলার মধ্যে যোগাযোগ সহজ করতে নতুন সড়ক, সেতু ও মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের দাবি দীর্ঘদিনের।
তাদের মতে, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে জেলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ যেমন উন্নত হবে, তেমনি রাজধানী ঢাকা, উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ আরও সহজ হবে। এর ফলে কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার এসব প্রকল্পের মধ্যে সড়ক প্রশস্তকরণ, মহাসড়ক উন্নয়ন, নতুন সেতু নির্মাণ, বিদ্যমান সড়কের মানোন্নয়ন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ শক্তিশালী করার বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে পাবনা জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন জেলার তুলনায় পাবনার জন্য প্রস্তাবিত উন্নয়ন বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। এটি জেলার যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের অগ্রাধিকার এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকার প্রতিফলন।
এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা শেখ রবিউল আলম রবি বলেন, পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি একাধিকবার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক ও দাপ্তরিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। তাঁর এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই জেলার জন্য ২২টি উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
অনুমোদনের অপেক্ষায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় ‘পাবনা জেলা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, সেতু-কালভার্ট নির্মাণ, হাট-বাজার আধুনিকায়ন, রেলক্রসিং নির্মাণ, ঘাটলা উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে পাবনা পৌর এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন এবং নগর সড়ক ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্য পৃথক প্রকল্পও প্রণয়নের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গ্রাম ও শহর—উভয় এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে আসতে পারে বড় পরিবর্তন
পাবনা দেশের অন্যতম কৃষি, দুগ্ধ ও ক্ষুদ্র শিল্পসমৃদ্ধ জেলা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অনেক এলাকায় দুর্বল সড়ক যোগাযোগের কারণে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে কৃষকদের বাড়তি খরচ বহন করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে অনেক গ্রামীণ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং কৃষকেরা অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সড়ক নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হবে। কৃষিপণ্য, দুধ, সবজি এবং অন্যান্য উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।
পাবনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গ্রামীণ হাট-বাজার আধুনিকায়ন হলে উৎপাদক ও ক্রেতা উভয়েই উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে পৌর এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যারও সমাধান হবে।
সরাসরি ট্রেনে রাজধানীর সঙ্গে সংযোগ আরও সহজ
পাবনাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির অন্যতম ছিল ঢাকা পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালু করা। রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ঘোষণা দিয়েছেন, চলতি বছরের আগস্ট থেকে ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, সরাসরি ট্রেন চালু হলে শুধু যাতায়াত সুবিধাই বাড়বে না, বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে পাবনার ওষুধ শিল্প, দুগ্ধশিল্প, কৃষিপণ্য এবং তাঁতশিল্পের জন্য এই যোগাযোগ ব্যবস্থা বড় সহায়ক হবে।
ফেরিঘাট ও সেতু প্রকল্পে নতুন সম্ভাবনা
পাবনা থেকে ঢাকায় যাতায়াত সহজ করার জন্য কাজিরহাট-খায়েরচর ফেরিঘাট স্থানান্তরের উদ্যোগকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ডিপিপি প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে।
এ ছাড়া কাজিরহাট-আরিচা-রাজবাড়ী ওয়াই টাইপ সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিল্পায়নে গুরুত্ব
উন্নয়ন পরিকল্পনায় পাবনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে পাবনা সদর হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ, পাবনা মেডিকেল কলেজে পৃথক ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ, কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন, ক্যান্সার চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালের আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন শিল্প স্থাপন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে সহজ শর্তে ঋণ এবং তাঁত ও হোসিয়ারি শিল্পে বিশেষ প্রণোদনার উদ্যোগ জেলার কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যা বললেন শিমুল বিশ্বাস
পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, “পাবনার উন্নয়নকে আমরা একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে এসেছি। শুধু সড়ক বা অবকাঠামো নয়, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন, কৃষি এবং কর্মসংস্থান—সব খাতকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছি। প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জেলার সার্বিক উন্নয়নের নতুন ভিত্তি তৈরি হবে।”
তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে প্রকল্পটির যাচাই কমিটির সভা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত অনুমোদনের জন্য কাজ চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও আধুনিক যোগাযোগ ও নাগরিক সুবিধার আওতায় আসবে।”
শিমুল বিশ্বাস আরও বলেন, “আমার লক্ষ্য হলো এমন একটি পাবনা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো অঞ্চল অবহেলিত বা অনুন্নত থাকবে না। গ্রাম ও শহরের মধ্যে উন্নয়নের বৈষম্য কমিয়ে এনে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চাই। কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নই আমাদের মূল অঙ্গীকার। দল-মত নির্বিশেষে জেলার প্রতিটি মানুষের জন্য উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”
তিনি বলেন, “ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চালু, ফেরিঘাট উন্নয়ন, সড়ক অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে পাবনা উত্তরাঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। আধুনিক, সমৃদ্ধ ও পরিকল্পিত পাবনা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
বাস্তবায়নই এখন মূল চ্যালেঞ্জ
তবে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় বড় প্রকল্প ঘোষণার চেয়ে সেগুলোর সময়মতো বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। তাই জনগণের প্রত্যাশার পাশাপাশি বাস্তবায়ন সক্ষমতার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তারপরও জেলার মানুষ আশাবাদী। কারণ, একসঙ্গে যোগাযোগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে এত বড় পরিসরে উন্নয়ন পরিকল্পনা এর আগে খুব কমই দেখা গেছে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পাবনা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী জেলায় পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।