একসময় ট্রেনের হুইসেলের শব্দে মুখর থাকতো জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ ও তিলকপুর রেলওয়ে স্টেশন। যাত্রীদের কোলাহল, পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল স্টেশন দুটি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন বদলে গেছে। জনবল সংকট, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় গুরুত্ব হারাচ্ছে স্টেশন দুটি। অযত্নে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ, আর প্রতিদিন বাড়ছে যাত্রীদের দুর্ভোগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুই স্টেশনের মধ্যে জামালগঞ্জ স্টেশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই স্টেশন থেকে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের নিদর্শন পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার (সোমপুর মহাবিহার)-এর দূরত্ব মাত্র প্রায় চার কিলোমিটার। দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটকের জন্য এটি হতে পারতো সবচেয়ে সহজ রেলপথের প্রবেশদ্বার। কিন্তু স্টেশনের অব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত রেলসেবার অভাবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে তিলকপুর একটি পৃথক গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন হলেও সেখানেও একই ধরনের অবহেলা ও যাত্রী ভোগান্তি বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত তিন-চার বছর ধরে জামালগঞ্জ স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থামানো হয় না। পরিবর্তে প্ল্যাটফর্মবিহীন ২ নম্বর লাইনে ট্রেনের যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়। ফলে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে ওঠানামা করতে হয়। অনেক সময় যাত্রীরা নির্ধারিত স্টেশনে নামতেই পারেন না; পাশের স্টেশনে গিয়ে নামতে বাধ্য হন। এতে সময় ও অর্থ—দুইয়েরই অপচয় হচ্ছে। তিলকপুর রেলস্টেশনেও যাত্রীসেবা ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে একই ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা শামীম হোসেন বলেন, ‘একসময় জামালগঞ্জ স্টেশনে মানুষের অনেক ভিড় ছিল। এখন ট্রেনই থামে না। স্টেশনটিও অবহেলায় পড়ে আছে। দ্রুত সংস্কার করে আগের মতো প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থামানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’
রাসেল আহম্মেদ বলেন, ‘প্ল্যাটফর্মে ট্রেন না থামায় খুব কষ্ট করে ওঠানামা করতে হয়। বিশেষ করে বয়স্ক, নারী ও শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’
আরেক যাত্রী মোমেনা খাতুন বলেন, ‘অনেক সময় ঠিকমতো নামতেই পারি না। নিরাপদে ট্রেনে ওঠানামার সুযোগ নেই। আমরা চাই আগের মতো প্ল্যাটফর্মেই ট্রেন থামুক।’
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, জামালগঞ্জ স্টেশনকে আধুনিক ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা গেলে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এটি হতে পারে অন্যতম সহজ যাতায়াতের মাধ্যম। একইসঙ্গে তিলকপুর স্টেশনেও যাত্রীসেবা উন্নত হলে পুরো অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা আরও গতিশীল হবে। এতে পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জয়পুরহাট ডেভেলপমেন্ট ফোরামের সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল বাতেন বলেন, ‘জামালগঞ্জ শুধু একটি রেলস্টেশন নয়, এটি এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই দ্রুত সংস্কার, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা জরুরি।’
এ বিষয়ে জয়পুরহাট রেলওয়ের সহকারী স্টেশন মাস্টার আমেনা খাতুন বলেন, ‘জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’
স্থানীয়দের দাবি, জামালগঞ্জ ও তিলকপুর—দুই রেলস্টেশনই উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অবহেলার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত সংস্কার, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং নিরাপদ প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা হলে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে, রক্ষা পাবে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ। একইসঙ্গে জামালগঞ্জ স্টেশনকে কেন্দ্র করে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের পর্যটন সম্ভাবনাও আরও বিকশিত হবে।