রাজশাহীর হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশনে চলন্ত ট্রেনের ওয়াগন থেকে তেল চুরির ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে ‘ঢাকা মেল সিক্স ডাউন’ ট্রেনের পেছনে জুড়ে দেওয়া ওয়াগন থেকে তেল চুরি করা হয়। এ ঘটনায় অন্তত ছয় জন জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, হরিয়ান স্টেশনে ট্রেনটি ধীরে ধীরে চলছে। এ সময় কয়েকজন যুবক ওয়াগন থেকে তেল নামাচ্ছে। জগ দিয়ে তেল তুলে জারে ঢুকিয়ে তা নিচে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মাত্র তিন মিনিটের যাত্রাবিরতির সময় তেল চুরি শুরু হয়। এমনকি ট্রেন চলন্ত অবস্থায়ও তেল নিয়ে কয়েকজনকে নামতে দেখা যায়। তবে ঠিক কত পরিমাণ তেল চুরি হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে আন্তঃনগর ঢাকাগামী ট্রেনগুলোর পাওয়ার কারে তেল দেওয়ার জন্য ওয়াগনগুলো নিয়ে আসা হয়েছিল। তেল দেওয়ার পর দুটি ওয়াগন ‘ঢাকা মেল সিক্স ডাউন’ ট্রেনে জুড়ে দেওয়া হয়। পরে ওয়াগন দুটি ঈশ্বরদীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। লোকাল ট্রেন হওয়ায় ‘ঢাকা মেল সিক্স ডাউন’ হরিয়ান স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। সেই সুযোগেই ওয়াগন থেকে তেল চুরি করা হয়।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, হরিয়ান স্টেশন এলাকায় তেল চুরির ঘটনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে তেল চুরি হয়ে আসছে। সাধারণত রাতের বেলায় এসব ঘটনা ঘটলেও মাঝেমধ্যে দিনের বেলায়ও চুরি হয়। মঙ্গলবারের ঘটনার সময় ওয়েম্যান কিরন আলী, তার ভাই নয়ন আলী ও মিলনসহ কয়েকজন সেখানে ছিলেন। তারা ওয়াগনে উঠে জার, বোতল ও জগে করে তেল নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে যান।
হরিয়ান স্টেশনে ট্রেন থেকে তেল চুরির ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে। এতে হরিয়ান রূপসী ডাঙ্গার রিপন, হরিয়ান সাজিপাড়ার নাহিদ, হরিয়ান বাজারের আলামিন, হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশন এলাকার বাসিন্দা কিরন আলী, রক্সি ও মিলনকে দেখা গেছে। ভিডিওতে কয়েকজনকে ওয়াগনের ওপরে এবং অন্যদের রেললাইনের পাশে অবস্থান করতে দেখা যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, রেলওয়ের ওয়েম্যানদের সঙ্গে যোগসাজশে বহিরাগতরা তেল চুরিতে জড়িত। তাদের মধ্যে কিরন আলী নেসকোর কাটাখালী বিদ্যুৎ স্টেশন সাইডিং লাইনের টিএলআর ওয়েম্যান। নেসকোর লাইনে দায়িত্ব থাকলেও মেট কামরুল ইসলাম তাকে মূল লাইনে কাজ করান। মেট কামরুলের সঙ্গে যোগসাজশে কিরন বিভিন্ন সময় এমন কর্মকাণ্ডে জড়ান।
ভিডিওতে দেখা যায়, মাস্ক পরা কিরন একটি সাদা বস্তা ওয়াগন থেকে নিচে নামিয়ে দিচ্ছেন। নিচে থাকা কয়েকজন সেটি নিয়ে সরে যান। পরে ওয়াগনের ভেতর থেকে তেল বের করে ছোট বালতি ও জারকিন নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়। ট্রেন চলতে শুরু করলে কয়েকজন দ্রুত নেমে গেলেও কিরনকে শেষ পর্যন্ত ওয়াগনের ওপর দেখা যায়। পরে তিনিও একটি জগে তেল নিয়ে নেমে যান বলে ভিডিওতে দেখা গেছে।
ট্রেনটি চলতে শুরু করলে ওয়াগন থেকে দুজন দ্রুত নেমে যান। ওয়াগনে থেকে যান কিরনসহ আরও একজন। পরে তারা একটি ছোট বালতি নিচে নামিয়ে দেন। এ সময় নীল রঙের টি-শার্ট পরা এক যুবক চলন্ত ট্রেনের পেছনে দৌড়ে আসছিলেন। ওয়াগন থেকে তেলভর্তি একটি জারকিন নামিয়ে দিলে ওই যুবক সেটি তুলে নেন। পরে ওয়াগনে থাকা অপর যুবকও নেমে যান। তবে কিরন থেকে যান ওয়াগনে। সবশেষে তিনি একটি জগে করে তেল নিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে পড়েন।
তবে তেল নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওয়েম্যান কিরন আলী। তিনি বলেন, তেল নেওয়ার ঘটনায় আমার ছোট ভাই নয়নসহ অন্যরা জড়িত ছিলেন। নয়ন তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন এলাকায় কাজ করছিলেন। বিষয়টি যাচাই করতে মেট কামরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে মেট কামরুল ইসলামের সঙ্গে কিরন আলীর দীর্ঘদিনের সখ্যতা রয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে কামরুল ইসলাম বলেন, সকালে ট্রেন এলে আমাদের পানি খাওয়ার জন্য আধা ঘণ্টা বিরতি দেওয়া হয়। এ সময় যে যার মতো সময় কাটায়। কিরন আমাকে কিছু না বলে কোথায় গিয়েছে, আমি বলতে পারবো না।
হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার আরিফ হোসেন বলেন, ‘ঢাকা মেল সিক্স ডাউন ট্রেনটি হরিয়ান স্টেশনে মাত্র তিন মিনিট দাঁড়ায়। ওই সময় পাবনা থেকে ঢালারচর এক্সপ্রেস ট্রেন আসছিল। সেটির সঙ্গে ট্রেনের ক্রসিং নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম আমি। এ সময় তেল চুরির ঘটনা ঘটে। এসব দেখভালের জন্য রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও রেলওয়ে পুলিশ রয়েছে। আমাদের কিছু করার নেই।’
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আরএনবির চিফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলাম বলেন, ‘তেল চুরির ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ফোর্স পাঠানো হয়েছিল। তবে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। ভিডিওটি আমরা দেখেছি। জড়িতদের চেনা যাচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা হবে। অভিযুক্তদের আটকে অভিযান অব্যাহত আছে।’
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ জানান, তারা তেল চুরির ভিডিওটি দেখেছেন। এ বিষয়ে রেলওয়ের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেলওয়ের ভেতরের বা বাইরের যারাই এ ঘটনায় জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।









