১৯৭৯ সালে চালু হওয়া বরেন্দ্র রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস একসময় উত্তরবঙ্গের বহু মানুষের কর্মসংস্থান করেছিল। তবে টানা লোকসানে ২৩ বছর আগে ২০০৩ সালে মিলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল প্রায় ২৬ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই কারখানা।
এবার প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হাত ধরে ১৫ মাস আগে পরিত্যক্ত এই কারখানাতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে। এখানে দিন-রাতে আড়াই হাজারের বেশি কর্মী দক্ষ হাতে তৈরি করছেন বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ ও লাগেজ। সেই ব্যাগ চলে যাচ্ছে হাজার হাজার মাইল দূরের যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নামীদামি ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্রে।
সরকারি মালিকানাধীন রাজশাহী টেক্সটাইল মিলের পাশাপাশি রাজশাহী জুট মিলও সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে (পিপিপি) চালু করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। দুইটি কারখানায় এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করছেন। শিগগিরই এই সংখ্যা আরও বাড়বে। এ ছাড়া নগরীর সপুরা এলাকার বিসিক শিল্পনগরে একটি বন্ধ বেসরকারি কারখানা ভাড়ায় চালু করেছে গ্রুপটি। এখানে ব্যাগ উৎপাদনে কাজ করছেন প্রায় এক হাজার মানুষ।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রাজশাহী টেক্সটাইল মিলের কারখানায় শুধু ব্যাগ উৎপাদন হলেও পাটকলের কারখানায় জুতা, তাঁবু ও ছাতা বানানো হচ্ছে। সেই জুতা ও তাঁবু রফতানি হচ্ছে। শিগগিরই ছাতা রফতানিও হবে। উৎপাদনের পাশাপাশি নতুন ইউনিট চালুর কাজ এগিয়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন কর্মীরা।
প্রাণ-আরএফএলের গ্রুপের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাদের জুতা ও লাগেজ রফতানি ছিল ৯২ কোটি টাকা। গত অর্থবছর সেই রফতানি বেড়েছে ৯২ শতাংশের বেশি। রফতানি হয়েছে ১৭৭ কোটি টাকার জুতা ও লাগেজ।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘জুতা ও লাগেজের ভালো ক্রয়াদেশ আসছে। তবে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে এই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি আছে। তাই দ্রুত সমাধান হিসেবে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’
আরএফএল গ্রুপের জুতা, ব্যাগ, লাগেজ ও তাঁবুর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মো. রাহাত হোসেন বলেন, ‘২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিটিএমসি থেকে মিলটি বুঝে পান। তারপর প্রয়োজনীয় সংস্কার করে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাগের উৎপাদন শুরু হয়।’
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, কারখানা তিনটিতে বর্তমানে যারা কাজ করছেন তাদের অনেকে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় কাজ করতেন। রাজশাহীতে কারখানা চালু হওয়ায় নতুন চাকরি নিয়ে পরিবার পরিজনসহ চলে এসেছেন। এখন নিজের বাড়িতে থেকে কাজ করছেন। এই বিকেন্দ্রীকরণে রাজধানী ও পাশের সাভার-আশুলিয়া নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করবে। কর্মীদের মধ্যে একধরনের মানসিক স্বস্তি ফিরেছে।
৩০ বছর বয়সী স্বপ্না খাতুন একসময় গাজীপুরে কাজ করার সময় তার ছোট মেয়েকে রাজশাহীতে রেখে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন তিনি রাজশাহীর পবা উপজেলার বাড়ি থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরের একটি কারখানায় কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘দূরে কাজ করলে সন্তানের পড়াশোনা ও পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়ভাবে চাকরি হলে জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়।’
গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা ও কারখানার প্রোডাকশন কর্মী শঙ্করী রানী বলেন, ‘আমার চাকরি পরিবারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার স্বামী কর্মকার, কিন্তু তার আয় সংসার চালাতে যথেষ্ট ছিল না। এখানে কাজ করে আমি পরিবারের খরচ ও দুই মেয়ের পড়ালেখার জন্য সহায়তা করতে পারি। আমাদের শিফট সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত, এক ঘণ্টার মধ্যাহ্ন বিরতিসহ।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরোনো কারখানা ভবনের ছাদটা বেশ উঁচু। খাঁচকাটা ধাঁচের ছাদে লাগানো গ্লাস দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করছে। ফলে বৈদ্যুতিক আলো লাগছে কম। এদিকে কর্মব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন শত শত কর্মী। কৃত্রিম চামড়া, ফোম ও কাপড় কাটা থেকে শুরু করে গ্লু লাগানো, সেলাই ও ফিনিশিংয়ের পর ব্যাগের মোড়কজাতের কাজ করছেন তারা।
কারখানাটিতে অপারেটর পদে কাজ করেন চাঁপা বেগম। আগে গাজীপুরের একটি কারখানায় কাজ করতেন তিনি। তখন তার ছোট্ট মেয়েকে গ্রামে রেখে যেতে হয়েছিল। এখন রাজশাহীর পবা উপজেলার থেকে এখানে কাজে আসেন। চাঁপা বেগম বলেন, ‘বাড়ির কাছাকাছি ফিরে আসায় তার জীবনযাত্রার খরচ কমেছে। পরিবারের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবন আবার গুছিয়ে নিতে পেরেছেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, মেয়েকে এখন তার কাছে রাখতে পারছেন।’
গ্রুপটির কর্মকর্তারা জানান, কারখানা চত্বরে একটি গুদামের নির্মাণকাজ চলছে। পাশেই আরেকটি উৎপাদন ইউনিটের কাজ শুরু হবে। আর মাঝখানে থাকা একটি পুকুরের খনন চলছে। এখানে মাছ চাষ হবে। সব মিলিয়ে কারখানাটিতে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কারখানার প্রোডাকশন ম্যানেজার রাজীব কবিরাজ বলেন, ‘কারখানার কর্মীরা ভর্তুকি মূল্য ৮ টাকায় দুপুরের খাবার খেতে পারেন। যাদের বাড়ি অনেক দূরে, তারা মাসে ২০০ টাকায় ডরমিটরিতে থেকে কাজ করতে পারেন। বর্তমানে দেড় শতাধিক কর্মী ডরমিটরিতে থাকেন।’
এদিকে রাজশাহী কাটাখালী এলাকার শ্যামপুরে রাজশাহী পাটকলের কারখানা ভবনে জুতা, ছাতা ও তাঁবু উৎপাদন চলছে পুরোদমে। পাশের একটি ভবনের সংস্কারকাজ চলছে। সেখানে সারি সারি মেশিন আমদানি করে রাখা হয়েছে।
১৯৩৯ সালে স্থাপিত এই পাটকলটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মিলটি বিজেএমসি থেকে বুঝে পায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তারপর ডিসেম্বরে এখানে উৎপাদন শুরু হয়। এখন পর্যন্ত কারখানাটিতে কাজ করেন ১ হাজার কর্মী। নতুন ইউনিট চালু হলে কর্মসংস্থান গিয়ে দাঁড়াবে ৪ হাজারে, এমনটাই জানালেন কর্মকর্তারা।
কারখানাটির তাঁবুর উৎপাদনে কাজ করেন রাজশাহীর ন্যাশনাল সাইন্স রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজির কলেজের শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার। স্বামীর বাড়িতে থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করছেন তিনি। শারমিন আক্তার বলেন, ‘ঢাকা বা অন্য কোথাও চাকরি করলে হয়তো পড়াশোনা করতে পারতাম না। বাড়িতে থাকার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারছি। বাড়তি আয়ের কারণে পরিবারেও সচ্ছলতা ফিরেছে।’
সরকারি বন্ধ মিল চালু করায় উৎপাদন দ্রুত শুরু করা গেছে বলে জানালেন আরএফএল গ্রুপের জুতা, ব্যাগ, লাগেজ ও তাঁবুর সিওও মো. রাহাত হোসেন। তিনি বলেন, ‘জমি ক্রয়, উন্নয়ন থেকে শুরু করে উৎপাদন শুরু করতে দুই বছরের বেশি সময় লেগেছে। পরিত্যক্ত কারখানায় আমরা তিন মাসের মধ্যে উৎপাদন শুরু করেছি। এই অবশ্যই বড় একটি সুযোগ তৈরি করেছে। মফস্বলে কারখানা করলে স্থানীয় লোকজনের অনেক সহযোগিতা পাওয়া যায়। এখানে যখন আমরা কারখানার কাজ শুরু করি, তখন অনেকে প্রতিদিনই আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন আমরা কবে উৎপাদন শুরু করবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার বাইরে মফস্বলে পণ্য উৎপাদনে কর্মীদের বেতন বাবদ কিছুটা সাশ্রয় হলেও কাঁচামাল সরবরাহে খরচ বেশি, তা ছাড়া বিদ্যুতের সমস্যা থাকায় উৎপাদন ব্যয় বেশি হয়। এখানে সরকারের নজর দিলে শিল্পায়নে গতি বাড়বে। কর্মসংস্থান হবে। রফতানি আয়ও বাড়বে।’
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে বাংলাদেশের শিল্পখাত বিকেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। তাদের ভাষ্যমতে, ঢাকা থেকে ছোট শহরে চলে যাওয়া শ্রমিকরা কম জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে বেশি ক্রয়ক্ষমতা ভোগ করতে পারেন।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘আমরা মনে করি দেশের উন্নয়নের জন্য ঢাকাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তাই আমরা উত্তরবঙ্গে এই বৃহৎ শিল্প প্রকল্প শুরু করেছি। এর মাধ্যমে রাজশাহীর হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন এবং স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে।’
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য মহৎ। আমরা মনে করি, কাজের জন্য ঢাকায় যাওয়ার দিন ফুরিয়ে আসছে। বরং আমরা আগামী দিনে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে শিল্প স্থাপন করে চাকরির অফার লেটার নিয়ে ঘুরবো। আমরা রাজশাহীতে শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ করছি এবং প্রচুর লোকের কাজের সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই কারখানাটি হবে সম্পূর্ণ সাসটেইনেবল গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। এই কারখানার পণ্য শতভাগ রফতানিমুখী। আমরা এখানে নারীদের কর্মসংস্থান তৈরির জন্য নতুন নতুন ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করছি।’