ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পাটের বাজারে ভ্যান ও নসিমন থেকে একে একে নামানো হচ্ছিল কৃষকের শ্রম-ঘাম ফলানো ‘সোনালি আঁশ’। কারও হাতে আঁটি, কারও ভ্যানে স্তূপ করে রাখা। কিন্তু সেই পাট নিয়ে কৃষকের মুখে ছিল না স্বস্তির হাসি। বরং ছিল দরদাম নিয়ে উৎকণ্ঠা আর হতাশা।
দুই সপ্তাহ আগেও যে পাট মণপ্রতি ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, গত সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে সেই একই পাটের দাম নেমে আজে ৩ হাজার ২০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি পাটের দাম কমেছে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। এতে ভালো ফলন পেয়েও উৎপাদন খরচ ও প্রত্যাশিত লাভ নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন রাজশাহীর পাটচাষিরা।
কৃষকদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগী ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে পাটের দর অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে নতুন পাটের সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে।
সরেজমিনে পবা উপজেলার নওহাটা হাটে গিয়ে দেখা যায়, অল্প পরিমাণে নতুন পাটের কেনাবেচা শুরু হয়েছে। কৃষকেরা ভ্যান, ভটভটি ও নসিমনে করে পাট নিয়ে আসছেন। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দরদাম করছেন। কিন্তু আশানুরূপ দাম না পেয়ে কেউ পাট বিক্রি করছেন, আবার কেউ দাম না পেয়ে পাট বাড়িতে ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
উপজেলার চর মাঝারদিয়ার এলাকার কৃষক সাইফুল ইসলাম ৬৫ মণ পাট নিয়ে নওহাটা হাটে এসেছিলেন। দুই সপ্তাহ আগে তিনি একই মানের ১০ মণ পাট ৪ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করেছিলেন। সেদিন তাঁর হাতে এসেছিল ৪০ হাজার টাকা।
সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে ৪ হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি করেছি। আজ একই মানের পাট ৩ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এক মণ পাটে ৮০০ থেকে হাজার টাকা কমে গেছে। আমরা তো এক-দুইশ’ টাকা কমার কথা মেনে নিতে পারি। কিন্তু এভাবে একসঙ্গে হাজার টাকা কমে গেলে কৃষক যাবে কোথায়? পাটের পেছনে এত দিন খেটে যদি এই দাম পাই, তাহলে কষ্টটাই শুধু থেকে যায়।’
পবা উপজেলার দারুশা এলাকার কৃষক বাবু ১৪৯ কেজি পাট নিয়ে হাটে এসেছিলেন। ব্যবসায়ীরা মণপ্রতি ৩ হাজার ৪০০ টাকা দাম বলায় তিনি পাট বিক্রি না করে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘এর আগে ৪ হাজার টাকা মণ দরে ১২ মণ পাট বিক্রি করেছি। আজ ৪ মণ ১৫ কেজি পাট এনেছিলাম। আমি ৪ হাজার টাকা চেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যবসায়ীরা ৩ হাজার ৪০০ টাকা বলছে। প্রায় এক হাজার টাকা কম। এত কম দামে বিক্রি করে লাভ কী? বাড়িতে আরও ২২ মণ পাট আছে। দাম না বাড়লে এখন আর বিক্রি করবো না।’
হাটে এমন আরও কয়েকজন কৃষককে পাট বিক্রি না করে ফিরতে দেখা যায়। মোহনপুরের কেশরহাট এলাকার কৃষক সালমান আলীও সাড়ে চার মণ ভালো মানের পাট নিয়ে এসেছিলেন। তিনি মণপ্রতি ৪ হাজার টাকা দাম চাইলেও ব্যবসায়ী দিতে চাচ্ছিলেন ৩ হাজার ৫০০ টাকা। শেষ পর্যন্ত পাট বিক্রি না করেই ফিরে যান তিনি।
কৃষক সালমান আলী বলেন, ‘এবার ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু চাষের খরচও কম হয়নি। ভালো দাম পাবো- এ আশায় পাট নিয়ে হাটে এসেছিলাম। ৩ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করলে লাভ খুব সামান্য থাকবে। তাই পাট ফেরত নিয়ে যাচ্ছি। বাড়িতে আরও পাট আছে। দাম বাড়লে বিক্রি করবো।’
নওহাটার মুসকান ট্রেডার্সের পাট ব্যবসায়ী মিলন আলী বলেন, ‘জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে পাটের সরবরাহ কম ছিল। তখন সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ হাজার টাকা মণ দরে পাট কিনেছেন। এখন নতুন পাট বাজারে ওঠায় দাম কমেছে। বর্তমানে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে পাট কিনছেন।’ তিনি বলেন, ‘গত মাসে বেশি দামে কেনা পাট এখনো আছে। দাম না বাড়লে ব্যবসায়ীদেরও লোকসান হবে।’
নওহাটা পাট হাটের ইজারাদার অমল দাস বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত হাটে পাটের বেচাকেনা হয়। প্রতি হাটে গড়ে প্রায় ২ হাজার মণ পাট বিক্রি হয়। দুই সপ্তাহ আগে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ৩ হাজার ২০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় নেমেছে।’
পাটের দর পতনের বিষয়ে পাট অধিদফতর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. নাদিম আক্তার বলেন, ‘পাট উন্মুক্ত বাজারে কেনাবেচা হয়। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে একেকটি হাটে পাটের দাম কম-বেশি হওয়া স্বাভাবিক। সরকার পাটের দর নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে, তবে বর্তমানে সরকারিভাবে পাটের দাম নির্ধারণ করা হয় না।’
পবা উপজেলার নওহাটা হাটে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাটের দাম কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নওহাটা এলাকায় বেশ কয়েকটি জুট মিল রয়েছে। এসব মিলই স্থানীয় বাজার থেকে সবচেয়ে বেশি পাট কেনে। জুট মিলগুলো নওহাটা বাজার থেকে তুলনামূলক কম পাট কিনলে বাজারে চাহিদা কমে যায় এবং দামও কমে। আবার মিলগুলো বেশি পরিমাণে পাট কিনলে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ে।’
তিনি বলেন, ‘চলতি বছর রাজশাহীতে সম্ভাব্য পাট উৎপাদন ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৬০ হাজার ৪৯৪ কুইন্টাল। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন বাড়ায় বাজারে পাটের সরবরাহও বাড়তে পারে। ফলে শুরুতে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার কারণে বাজারদর কিছুটা কমে থাকতে পারে।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে। এক বছরে আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর। আগাম জাতের পাটে কৃষকেরা ভালো দাম পেয়েছেন। তবে নতুন পাট একসঙ্গে বেশি পরিমাণে বাজারে উঠলে সরবরাহ বেড়ে দাম কিছুটা কমতে পারে। পাটের ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের ঘরে এবার স্বস্তি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু হাটে এসে দামের এই পতনে সেই স্বস্তিই এখন বিষণ্নতায় বদলে যাচ্ছে। কৃষকদের আশঙ্কা, মৌসুমের ভরা সময়ে বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাট উঠলে দাম আরও কমতে পারে। ফলে ভালো ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ার শঙ্কাই এখন তাদের বড় দুশ্চিন্তা।’