জানাজার সময় তদন্ত করতে গিয়ে হামলার শিকার দুই পুলিশ, রাতেই বরখাস্ত

নন্দকুঁজা নদীতে ডুবে মারা যাওয়া দুই শিশুর সুরতহাল প্রতিবেদন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন নাটোরের গুরুদাসপুর থানার এক এসআই ও কনস্টেবল। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে দুই শিশুর জানাজার সময় তারা হামলার শিকার হন। 

তদন্তে ত্রুটি থাকার অভিযোগে রাতেই ওই দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে নাটোর পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নাটোরের পুলিশ সুপার শরিফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, মৃত দুই শিশুর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়েছিলেন গুরুদাসপুর থানার এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল রাকিব। তাদের তদন্তে নানা ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে। এ জন্য তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, হামলার শিকার হয়ে থানায় খবর দেন এই এসআই ও কনস্টেবল। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে গ্রামের মানুষের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ ঘটনায় থানায় কোনও অভিযোগ বা কাউকে আটক করা হয়নি।

এই দুই জন হলেন- গুরুদাসপুর থানার এসআই আবুল বাসার (৪৫) ও পুলিশ সদস্য রাকিব হোসেন (৩৬)।

মঙ্গলবার বিকালে গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে নদীতে ডুবে দুই শিশু মারা যায়। তারা হলো— ফারহান ইসলাম ও লাম ইসলাম। ফারহান ইসলাম চন্দ্রপুর গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে ও লাম ইসলাম একই গ্রামের বাবুল ইসলামের ছেলে। তারা দুই জনেই চন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, ফারহান ও লাম দুপুরে খাওয়ার পর নদী তীরের আমবাগানে খেলা করছিল। খেলার ছলে নন্দকুঁজা নদীর কিনারায় গোসল করতে নামে তারা। দুই জনের কেউই সাঁতার জানতো না। নদীর স্রোতে তারা দুই জনই তলিয়ে যায়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি শিশু দুটিকে তলিয়ে যেতে দেখে চিত্কার করতে থাকেন। কিছু সময় পরে দুই শিশু পানিতে ভেসে ওঠে। আশপাশের লোকজন তাদেরকে উদ্ধার করে নাটোর জেনারেল  হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক দুই শিশুকেই মৃত ঘোষণা করেন।

এদিন সন্ধ্যায় দুই শিশুর লাশ গ্রামের ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজার আয়োজন করা হয়। ওই জানাজায় বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় বিএনপি নেতা সামসুল হক জানান, জানাজার প্রস্তুতির সময় দুই পুলিশ সদস্য সেখানে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য লাশ দুটি থানায় নিতে চান। একপর্যায়ে লাশের ওপর থেকে কাফনের কাপড় সরিয়ে অনাবৃত করা হয়েছে— এমন অভিযোগ করেন উপস্থিত কয়েকজন। পুলিশের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন জানাজায় উপস্থিত লোকজন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুই শিশুর লাশ নিয়ে পুলিশের প্রশ্নবিদ্ধ তৎপরতায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে উত্তেজিত কয়েক ব্যক্তি দুই পুলিশ সদস্যের ওপর চড়াও হয়ে কিল-ঘুষি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা ওয়াপদা বাজারের একটি দোকানে আশ্রয় নেন।

বিএনপি নেতা সামসুল হক বলেন, সুরতহালের সময় পুলিশের আচরণে গ্রামের কমপক্ষে ১৫০০ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন। উত্তেজিত লোকজন পুলিশের আশ্রিত দোকানটি ঘিরে মারমুখী অবস্থান নেন। পরিস্থিতি বেগতিক হওয়ায়  দুই পুলিশ সদস্য গ্রামবাসীর কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চান। তবুও পুলিশ কিল-ঘুষি ও ইটপাটকেলের শিকার হতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসঙ্গে দুই শিশুর মৃত্যুতে পরিবার ও গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। ফলে পুলিশের ওপর চড়াও হন উপস্থিত লোকজন।

এ বিষয়ে জানতে গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নানের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তবে থানার তদন্ত কর্মকর্তা এস এম রিয়াজুল হাসান জানান, দুই পুলিশ সদস্যের রোষানলে পড়ার খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এক পর্যায়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দুই জনকে উদ্ধার করা হয়।