নাটোরে অন্তত ১০টি বিলের বুক চিরে প্রবাহিত জিয়া খালটি আত্রাইয়ে শুরু হয়ে হুসাগর নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। খনন পরবর্তী সময়ে খালের পানিতেই সেসব বিলের চাষাবাদ হতো। জেলেরা মাছ শিকার করতেন। কিন্তু পাঁচ দশকের ব্যবধানে প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে খাল তার অস্তিত্ব হারিয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে চলনবিলের বুক চিরে বয়ে চলা অন্যতম খালটি দখলমুক্ত করে পুনরায় খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সংকুচিত খালের আত্রাই নদী অংশে পানিপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে ২ কিলোমিটার খালের খননকাজ শুরু করেন। নাম দেওয়া হয় ‘জিয়া খাল’। গুরুদাসপুর পৌর সদরের আত্রাই নদীর চাঁচকৈড় মৎস্যজীবীপাড়া থেকে শুরু করে খোয়ারপাড়া হয়ে ধারাবারিষা ইউনিয়নের চরকাদহ গিয়ে শেষ হয়। সেখান থেকে ভিন্ন নাম নিয়ে পৃর্বদিকে কচুগাড়ি, তালবাড়িয়া, চাটমোহরের ছাইকোলা হয়ে সিরাজগঞ্জের হুসাগরে মিলিত হয়। এ ছাড়া পশ্চিমের চলনালী, পাঁচশিশা, দক্ষিণ নাড়িবাড়ি, সোনাবাজু হয়ে তুলশীগঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।
স্থানীয় লোকজন জানান, খননের সময় খালটির প্রস্থ ৪৩ ফুট থেকে কোথাও ৩৫ ফুট ছিল। কিন্তু চাঁচকৈড় মৎস্যজীবী পাড়া থেকে শুরু করে চরকাদহ পর্যন্ত অংশ দখল করে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে খালটি প্রবাহ হারিয়ে সরু ড্রেনে রূপ নিয়েছে। মরা খালে এখন আর পানিপ্রবাহ নেই।
খালপাড়ের প্রবীণ কৃষক আজগর আলী, মিনহাজ, শব্দের খাঁসহ পাঁচ জন বাসিন্দা জানান, খালটি খননের পর প্রবাহিত পানিতে গুরুদাসপুরের কান্টগাড়ি, ধারাবারিষা, চরকাদহ, চলনালী, সোনাবাজু, পাটপাড়া সিধুলী, পাবনার চাটমহোরের কয়েকটি এবং সিরাজগঞ্জের বেশ কয়েকটি বিলে চাষাবাদের জন্য পানির চাহিদা পূরণ হতো। তখন থেকে এই অঞ্চলে তিন ফসল চাষ শুরু হয়। চলতো ছোট বড় নৌকা। কিন্তু খালটি অব্যাহতভাবে দখল করায় বিলে চাষাবাদের জন্য কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
কৃষক আজগর আলী বলেন, ‘অতীতের কাগজপত্র অনুযায়ী খালটির গুরুদাসপুর অংশের ২ কিলোমিটার অংশ দখলমুক্ত করে খনন করা হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন কৃষকরা। আবার চাষাবাদ শুরু হবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘খালের উৎস্যমুখ থেকে শুরু করে পৌর শহরের মৎস্যজীবীপাড়া এবং খোয়ারপাড়া হয়ে চরদকাদহ পর্যন্ত স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে পাকা ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন। খালের ওই অংশটুকু দখলমুক্ত করা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তবে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে খালটি দখলমুক্ত করে খনন করা হলে এই এলাকার মানুষ উপকৃত হবেন।’
নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘অবৈধ দখলে জিয়া খালের স্মৃতি চিহৃ মুছে যাওয়ার পথে। অথচ একসময় এই খালটিই তিন জেলার বেশ কয়েকটি বিলের ফসল চাষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
তিনি বলেন, ‘খালটি পুনঃখননের প্রস্তাব পাঠানো হলেও অবৈধ দখল উচ্ছেদে প্রশাসনের তেমন কোনও তৎপরতা নেই। শুধু দায়সারা খনন নয়। খালটিতে পানিপ্রবাহ ফেরাতে খালপাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর খননের উদ্যোগ নিতে প্রশাসনের।’
গুরুদাসপুর বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার দেশজুড়ে খাল খনন কাজ শুরু করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় গুরুদাসপুরের জিয়া খালটি পুনঃখননের জন্য জিপিতে অন্তর্ভুক্তকরণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলেই খালটি উদ্ধার করে খনন করা হবে।’
গুরুদাসপুর উপজেলা কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, ‘খালটি একাধিকবার পরিদর্শন করেছি। খননের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে খালটি উদ্ধারে কাজ শুরু করা হবে।’