বাবা আসবেন ভেবে অপেক্ষায় ছোট্ট জুই, এলো নিথর দেহ

বাবা যে আর ফিরবেন না, তা জানে না ছোট্ট জুই। হয়তো প্রতিদিনের মতো বাবার ফেরার অপেক্ষাতেই আছে সে। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সরকারি বাসভবনে স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে রেখে দায়িত্ব পালনে গিয়েছিলেন সেনাসদস্য তাসনিম রিফাত। পরিবারের ধারণা ছিল, অন্য দিনের মতো দায়িত্ব শেষে আবারও ঘরে ফিরবেন। কিন্তু রিফাত আর ফিরছেন না—ফিরছে তার নিথর দেহ।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ার রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিংয়ের সময় দুর্ঘটনায় নিহত হন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মড কোরের সদস্য সৈনিক (গানার) তাসনিম রিফাত (২৮)। তার মৃত্যুর খবর রাজশাহীর পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের বিন্দারামপুর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই সেখানে চলছে স্বজনদের আহাজারি। সবচেয়ে কঠিন অপেক্ষাটি এখন ছোট্ট জুইয়ের—বাবা আর কোনোদিন তাকে কোলে নেবেন না, সেই সত্য বোঝার বয়সও হয়নি তার।

সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বেলা ১২টার দিকে হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ার রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিংয়ের সময় দুর্ঘটনাবশত ট্যাংকের ভেতরে গোলা বিস্ফোরিত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান রিফাত। তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ১৫ স্বতন্ত্র সাঁজোয়া স্কোয়াড্রনে কর্মরত ছিলেন।

রিফাতের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের বিন্দারামপুর গ্রামে। তার বাবা আসাদুল ইসলাম একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। তিন বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার মা। মায়ের মৃত্যুর শোক সামলে ওঠার আগেই এবার ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি আবারও গভীর শোকে ডুবে গেলো।

চার ভাইবোনের মধ্যে রিফাত ছিলেন দ্বিতীয়। তার বড় ভাই এবি মাহমুদ দীপ্ত এবং ছোট ভাই শামসাদ আহমেদ বিশাল। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার ছিল নিবিড় সম্পর্ক। আকস্মিক এই মৃত্যুর খবর কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা।

রিফাত ছিলেন বিবাহিত। স্ত্রী ও কন্যাসন্তান জুইকে নিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সরকারি বাসভবনে থাকতেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ছোট্ট মেয়েটিকে ঘিরেই ছিল রিফাতের অনেক স্বপ্ন। মেয়ের সঙ্গে সময় কাটানো, তাকে বড় হতে দেখা—সব স্বপ্নই ছিল তার। অথচ সেই মেয়েকেই বাবাহারা করে চলে গেলেন তিনি।

বাবা যে আর ফিরবেন না, তা জানে না ছোট্ট জুই

বুধবার দুপুরের দিকে গ্রামের বাড়িতে রিফাতের মৃত্যুর খবর পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। খবর পেয়ে প্রতিবেশীরাও ছুটে আসেন। বাড়ির ভেতরে স্বজনদের আহাজারি, বাইরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়। প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে কেউ যেন সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না।

পরিবারের জন্য অপেক্ষার এই সময়টি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে মরদেহ আসার অপেক্ষায়। বুধবার রাত ১০টায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জসিম হলে রিফাতের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে হেলিকপ্টারযোগে মরদেহ ঢাকায় নেওয়া হবে। সেখান থেকে রাজশাহী সেনানিবাসে আনার পর বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল নাগাদ পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করার কথা রয়েছে।

এখন বিন্দারামপুরের বাড়িতে অপেক্ষা শুধু শেষবারের মতো রিফাতকে দেখার। যে ছেলেকে পরিবার কর্মস্থলে পাঠিয়েছিল সুস্থ শরীরে, সেই ছেলেই ফিরছেন নিথর হয়ে।

একদিকে বাবাকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়া পরিবার, অন্যদিকে বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকা ছোট্ট জুই। একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে পুরো পরিবারের পৃথিবী। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দেওয়া রিফাতের ফিরে আসা তাই পরিবারের কাছে এখন শুধু একটি মরদেহের অপেক্ষা নয়—এ এক অপূরণীয় শূন্যতার শুরু।