দিনের ১৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না: কমেছে আয়, কীভাবে চলবে সংসার

‘কিছুদিন আগেও কাপড় ইস্ত্রির কাজ করে সংসার ভালোই চলছিল। এখনও একই কাজ করি; তবে আগের মতো আয় হচ্ছে না। বিদ্যুতের অতিমাত্রার লোডশেডিং আমার রোজগারের অর্থে টান পড়েছে। কাপড় ইস্ত্রি করে বর্তমানে যা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে মাসের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

আক্ষেপ করে বাংলা ট্রিবিউনকে কথাগুলো বলেছেন নাটোরের লন্ড্রি দোকানি আজগর আলী। তার দোকানটি গুরুদাসপুর থানা চত্বরে। আজগর আলীর ভাষ্য, দোকানটি পৌর শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হলেও প্রতি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কখনও আট, কখনও ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। এতে প্রত্যাশা অনুযায়ী কাপড় ইস্ত্রি করতে পারছেন না। ফলে আয় অর্ধেকে নেমেছে। আয় কম হওয়ায় সেই প্রভাব পড়ছে সংসারের ভাতের হাঁড়িতে।

তিনি বলেন, ‘যখন লোডশেডিং ছিল না তখন সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করতাম। আগে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকার মতো বিদ্যুৎ বিল আসতো। ১০ টাকা থেকে ২৫ টাকায় প্রতিদিন জামাকাপড় ইস্ত্রি করতে পারতাম ১২০ থেকে ১৫০টি। এতে প্রতিদিন ১ হাজার টাকার মতো আয় হতো। এখন দিনে ৫০টি কাপড়ও ইস্ত্রি করতে পারি না। সেই আয় ৩০০-৪০০ টাকায় নেমে এসেছে। উল্টো মাসে বিদ্যুৎ বিল বেড়ে তিন হাজারের ওপরে আসছে। মানুষের চাহিদা থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে কাপড় ইস্ত্রি করতে পারি না। দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুতের অপেক্ষায় অলস বসে থাকতে হচ্ছে।’

জনজীবনে নাভিশ্বাস 

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে শুধু যে আজগর আলীর জীবনে এমন নাভিশ্বাস তৈরি হয়েছে তা নয়। তার মতো বিদ্যুৎনির্ভর পেশায় থাকা বহু মানুষ আর্থিক টানাপোড়েনে আছেন। একই সঙ্গে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। আগের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পেলেও বিল বেশি আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক গ্রাহক। বিদ্যুতের  সমস্যা সমাধানে সরকারের জোর তৎপরতা দাবি এই এলাকার মানুষের।

পল্লী বিদ্যুতের তথ্য বলছে, নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ নাটোর সদর ও ২ ফুলবাগান এই দুটি অফিসের মাধ্যমে নাটোর এবং রাজশাহী অঞ্চলের ৯ লাখ গ্রাহক বৈদ্যুতিক সুবিধার আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে সমিতি-১ এর আওতাধীন রয়েছেন নাটোর জেলার সদর, নলডাঙ্গা, বাগাতিপাড়া, সিংড়া উপজেলা ছাড়াও রাজশাহী জেলার পুঠিয়া ও বাগমারা উপজেলার প্রায় ৫ লাখ গ্রাহক। এছাড়া সমিতি-২-এর আওতায় বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, লালপুর, বাগাতিপাড়া উপজেলার একাংশ এবং রাজশাহী জেলার বাঘা ও চারঘাট উপজেলার প্রায় ৪ লাখ গ্রাহক রয়েছেন। বিস্তৃত এই এলাকার লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করা হয় সিংড়া জোনাল অফিস, হাটগাংগোপাড়া সাব জোনাল অফিস, পুঠিয়া জোনাল অফিস, জামতলী সাব-জেনাল অফিস, বাগমারা জেনাল অফিস, নলডাঙ্গা সাব জোনাল অফিস, বাগাতিপাড়া সাব জোনাল অফিসের মাধ্যমে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, গত তিন মাস হলো চরম লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছেন গ্রাহকেরা। আগের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও বিদ্যুৎ বিল আসছে দ্বিগুণ।

নাটোর সদর উপজেলার দিঘাপতিয়া এলাকার বাসিন্দা কুমকুম আক্তার বলেন, ‘ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এতে দিন-রাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রচণ্ড গরমে রাতে ঘুমাতে পারছি আমরা।’

লালপুর উপজেলার বিলমারিয়া গ্রামের সালাহ উদ্দীন, নলডাঙ্গা উপজেলার মাধনগর এলাকার ফজলে রাব্বী জানান, স্বল্প সময় বিদ্যুৎ পেলেও দ্বিগুণের বেশি বিল আসছে। অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে বিদ্যুৎ সংকটে রাতে ঘুমাতেও পারছেন না।

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার টিএম মেসবাহ উদ্দিন জানান, এখন লোডশেডিং জাতীয় সমস্যা। তবে মিটার রিডিংয়ের ক্ষেত্রে রিডার বা অফিসের ভুলে কোনও গ্রাহকের বিল বেশি এসে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

লোডশেডিংয়ে আয় কমে সংসারে টান

নাটোর জেলা বন বিভাগের তথ্য বলছে, নাটোর জেলায় লাইসেন্সধারী স’মিল রয়েছে কয়েক শ। এসব স’মিলে পুরো জেলাজুড়ে শত শত শ্রমিক দিন মজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

এসব শ্রমিকের মধ্যে ইউসুফ আলী, ফরিদ খা, শমসের বাহাদুর জানান, তাদের মধ্যে কেউ চুক্তি ভিত্তিতে কেউ মাসিক বেতনে কাঠ চেরাইয়ের কাজ করেন। স’মিলে কাঠ থাকলেও তা চেরাই করতে পারছেন না। ফলে কমেছে তাদের মজুরি। এতে করে স্বপ্ল আয়ে সংসারের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই মানুষিকভাবে চিন্তিত অবস্থায় আছেন।

স’মিল মালিকরা জানান, স’মিলে কাঠের স্তূপ জমে গেলেও বিদ্যুতের অভাবে চেরানো সম্ভব হচ্ছে না। অথচ বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল ঠিকই আসছে। রাতদিন মিলিয়ে যতটুকু সময় কাজ করা যাচ্ছে তাতে শ্রমিকের মজুরি আর বিদ্যুৎ বিল দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। সবমিলিয়ে সংকটে দিন কাটাচ্ছেন তারা।

চালকলের উৎপাদনে ভাটা

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্যমতে, নাটোর জেলাজুড়ে চুক্তিবদ্ধ মিল রয়েছে ১৩৮টি। এর মধ্যে নাটোর সদরে ২৮, নলডাঙ্গায় ৪, সিংড়ায় ২৭, গুরুদাসপুরে ৪৫, বড়াইগ্রামে ২৭, লালপুরে ৫ ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় চালকল রয়েছে দুটি। সরকারি এই হিসাবের বাইরেও কয়েক শ চালকল রয়েছে। এসব চালকলে কয়ক হাজার শ্রমিক দিনমজুরি করে বেঁচে আছেন। চালকলের শ্রমিকেরা বলেন, ভোরে এসেও ধান সেদ্ধ শুরু করতে পারছেন না৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বিদ্যুতের জন্য বসে থাকতে হচ্ছে। ব্যবসা নিম্নমুখী হওয়ায় মিল মালিকরা অনেক শ্রমিককে কাজ থেকে ছাঁটাই করে দিয়েছেন।

নাটোর জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রউফ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে গত বছরের তুলনায় চাল উৎপাদন কমেছে। এ বছর চালকলগুলো সরকারি চাহিদার ১৬ হাজার ৬৭৫ মেট্রিক টন চাল দিতে সক্ষম হলেও বর্তমানে চাল উৎপাদন প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে চাহিদা থাকলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাল সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এখন আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে মিল মালিকদের। সংকটে পড়ছেন চালকলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বহু শ্রমিকও।’

যা বলছেন বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা 

নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার টিএম মেসবাহ উদ্দিন জানান, তাদের আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৪৫ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট। অথচ নাটোর ও কাটাখালি গ্রিড থেকে সর্বোচ্চ ১১০ থেকে ১১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। ফলে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘লোডশেডিং কমাতে সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ধীরে ধীরে লোডশেডিং কমে আসবে বলে আশা করছি আমরা।’