রাজশাহী মহানগরীর সাহেববাজারের কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির ঘটনায় সাত চোর এবং চুরি করা মালামাল কেনার অভিযোগে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করেছে।
এর মধ্যে সাত চোরের একজনকে খুলনা থেকে এবং অপর ছয় জনকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই স্বর্ণ কেনার সঙ্গে জড়িত স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে ঢাকার একটি এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার স্বর্ণ ব্যবসায়ী হলেন চাঁদপুর জেলার কচুয়া থানার সরকার বাড়ির বড়নীখোলা গ্রামের রফিক উদ্দিনের ছেলে রবিউল হাসান (৪৫)। তার কাছ থেকে চুরি হওয়া ২৬ ভরি স্বর্ণ, ৬২ ভরি রূপা এবং চোরাই স্বর্ণ বিক্রির ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর রবিউল অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ পাহারায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) আরএমপির মুখপাত্র গাজিউর রহমান সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, গত ১৯ জুন ভোরে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল রাজশাহী নগরীর সাহেববাজারে কারুশ্রী জুয়েলার্সের সামনে আসে। তারা বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রির দোকান বসিয়ে কৌশলে সেখানে জটলা তৈরি করে। একপর্যায়ে পাশের একটি স্বর্ণের দোকানের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে ওই দোকানের ভেতর দিয়ে কারুশ্রী জুয়েলার্সের পশ্চিম পাশের দেয়াল কেটে দোকানে ঢোকে। এরপর সিন্দুক থেকে প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ, ২ হাজার ২০০ ভরি রূপা, তিন বক্স স্বর্ণের নাকফুল এবং নগদ ২০ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তুর্য সরকার বাদী হয়ে বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা করেন।
ঘটনার পর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবিরের নির্দেশে মামলাটি সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। এরপর আরএমপির ডিবি, সাইবার ইউনিট ও সিসি ক্যামেরা ইউনিট একযোগে কাজ শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চোরচক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয়।
পুলিশ বলছে, চক্রটির সদস্যরা অত্যন্ত ধুরন্ধর প্রকৃতির। তারা একটি মোবাইল ফোন একবারের বেশি ব্যবহার করে না। তাদের ব্যবহৃত সিমকার্ডও অন্য ব্যক্তিদের নামে নিবন্ধিত। যাদের নামে এসব সিম নিবন্ধিত, তারা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের নামে সিম থাকার বিষয়টিও জানেন না। চক্রের সদস্যরা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে এবং কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় স্থায়ীভাবে অবস্থান করে না।
পুলিশের ভাষ্য, চক্রটি বছরে এক থেকে দুটি বড় ধরনের চুরি করে। একটি চুরির আগে তারা তিন থেকে চার মাস ধরে ওই এলাকা ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে অপরাধ সংঘটনের পাশাপাশি নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার পথও নির্ধারণ করে। কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির প্রায় চার মাস আগে চক্রের সদস্যরা রাজশাহীতে এসে বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করে ব্যবসার কথা বলে দোকান ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করে যায়।
ঘটনার পর পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে আরএমপির কয়েকটি চৌকস দল একযোগে অভিযান শুরু করে। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে বাগেরহাট জেলার মোংলা থানার শেহলাবুনিয়া মোর্শেদ সড়ক গ্রামের মো. ফজলুল হকের ছেলে মো. রুস্তম আলী শেখকে (৬৪) খুলনা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
অন্যদিকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া থানার মাধবপুরা (মাইল্যারহাট) গ্রামের আ. হাকিমের ছেলে স্বপন (৬২), একই গ্রামের মানিক ফকিরের ছেলে উজ্জল (৩৭), একই থানার মাধবপুরা গ্রামের মতি ফকিরের ছেলে রিয়াজ ওরফে সুমন ওরফে সুজন ওরফে গেদু (৩৯), বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার খোন্তাকাটা (জিমতলা) গ্রামের মোসাকের ছেলে আবু তালেব (৪৫), বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার পূর্ব খোন্তাকাটা গ্রামের শেখ ফজলু শেখের ছেলে মো. কালাম শেখ (৪৮) এবং পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া থানার মাধবপুরা (মাইল্যারহাট) গ্রামের আ. হাকিমের ছেলে ইউনুসকে (৪৫) গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে চোরাই মালামাল কেনার সঙ্গে জড়িত স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল হাসানকেও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে চুরি যাওয়া স্বর্ণ ও রূপা এবং নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়। চুরি যাওয়া অন্যান্য মালামাল উদ্ধার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের আজ আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড চাওয়া হবে।