রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি। তবে এখনও বিপাদসীমা অতিক্রম করেনি। তবে এই দুই জেলায় অনেক এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও ঘরের আঙিনা, কোথাও বসতঘরের আশপাশে পানি জমেছে। তলিয়ে গেছে আমন-আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও শাকসবজির ক্ষেত। প্লাবিত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে করে বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দি পরিবারগুলো।
জানা গেছে, কয়েক দিন আগেও জায়গাটি ছিল মানুষের আনাগোনায় মুখর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কেউ কেউ জায়গাটিকে বলছিলেন রাজশাহীর ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’। সেই চরের বড় অংশ এখন পানিতে থইথই করছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে শহরের দিকে চলে গেছেন অধিকাংশ বাসিন্দা। গবাদিপশু, ধান, জ্বালানি ও সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন তারা। এর মধ্যেই পদ্মার পানি বাড়তে থাকায় পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া এলাকায় নদীতীর ভাঙনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদীতীর রক্ষায় বসানো ব্লকের কিছু অংশ সরে গেছে। কোথাও কোথাও ব্লকের নিচের মাটি বেরিয়ে পড়েছে। নদীর স্রোত আরও বাড়লে ভাঙন তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া বেড়পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীতীরের বিভিন্ন স্থানে ব্লক সরে গেছে। কোথাও ব্লকের নিচ থেকে মাটি ধসে পড়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতীরে চাপও বাড়ছে। এ অবস্থায় তীরের কাছাকাছি থাকা বসতবাড়ি নিয়ে আতঙ্কে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর পেয়ে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর। তিনি বলেন, রাজশাহীতে পদ্মার পানি বাড়ছে। আগামী এক থেকে দুই দিন পানি আরও কিছুটা বাড়তে পারে। তবে আপাতত বিপদসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা নেই।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর আরও বলেন, আজকে (শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টায় পদ্মার বোয়ালিয়া পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২২ মিটার। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপদসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানির উচ্চতা ও স্রোত বাড়ায় নদীর কয়েকটি এলাকায় ভাঙনের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন ও নজরদারি করা হচ্ছে। হরিপুর এলাকার নদী পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কোথাও ভাঙন বা অন্য কোনও বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত রয়েছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া এলাকার নদীতীরে বাড়ি বেগম জাহানের। আতঙ্কিত কণ্ঠে তিনি বলেন, পদ্মার পানি আর এক ধাপ বাড়লেই আমার বাড়ি পানির নিচে চলে যাবে। চোখের সামনে নদীর ব্লক সরে যেতে দেখে প্রতিদিনই ভয় বাড়ছে। আমার বাড়িটি এখন চরম ঝুঁকিতে, কখন কী হয় সেই আতঙ্কে আছি। দ্রুত নদীতীর রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
একই এলাকার বাসিন্দা আবেদ আলী বলেন, পদ্মার পানি বেড়ে তীরে চাপ পড়েছে, শুরু হয়েছে ভাঙন। নদী রক্ষার জন্য বসানো ব্লকও সরে যাচ্ছে, তাই আমাদের ভয় আরও বেড়ে গেছে। কখন যে ভাঙন বাড়তে বাড়তে বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়, সেই চিন্তায় আমরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের বাড়িঘর ও জীবন-জীবিকা রক্ষার দাবি জানাচ্ছি।
পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজশাহী জেলা যুবদলের সদস্য ফরিদুল ইসলাম সাহেব জাদা বেড়পাড়া এলাকায় নদী রক্ষা ব্লক সরে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পদ্মার তীর রক্ষায় বসানো ব্লকগুলো ক্রমেই সরে যাচ্ছে। কীভাবে কাজটি করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। কেন ব্লক সরে গেল, সে বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের তদন্ত করা উচিত।
পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চর খিদিরপুরের ‘মিডিল চরে’ এখন অন্য রকম দুর্ভোগ। কিছুদিন আগেও যে চর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল, পানি বাড়ায় সেই চরের বড়ো অংশ এখন ডুবে গেছে। অনেক বাড়ির উঠান পানিতে তলিয়ে গেছে। কোনও কোনও বাড়ির চারপাশে পানি। কোথাও আবার পানির মধ্যেই গরু-ছাগল বেঁধে রাখা হয়েছে। রান্নার সুযোগ নেই অনেক পরিবারের। এর সঙ্গে রয়েছে সাপের আতঙ্ক। এই চরের বাসিন্দাদের বড় একটি অংশের জীবিকার প্রধান অবলম্বন গবাদিপশু। কারও ৫০টি, কারও ৬০টি, আবার কারও রয়েছে শতাধিক গরু। তাই ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে হলেও গবাদিপশু ফেলে যাওয়ার সুযোগ নেই। নৌকায় গাদাগাদি করে গরু নিয়ে শহরের দিকে আসছেন তারা। কোনও নৌকায় কয়েকটি গরু, আবার কোনও নৌকায় ২৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত গরু তোলা হচ্ছে। সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে ধান, জ্বালানি, মাছ ধরার জালসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, চরে এখন হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আছেন। অধিকাংশ পরিবার গরু-ছাগল নিয়ে শহরে চলে গেছে। কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, কেউ ভাড়া বাড়িতে উঠেছেন। তাঁর হিসাবে, চরটিতে প্রায় ১০ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। এসব পশুর জন্য পবার খড়খড়ি এলাকায় বিসিক শিল্পনগর-২ এবং নগরীর বিনোদপুর এলাকার বেতার মাঠে জায়গা করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। তবে এত বিপুলসংখ্যক গবাদিপশুর খাবার জোগাড় করাই এখন বড় সমস্যা।
ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম আরও বলেন, মানুষের খাবার কোনোভাবে জোগাড় করা গেলেও গবাদিপশুর খাবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন মালিকেরা। চরে কাঁচা ঘাস পাওয়া যাচ্ছে না। শহরে খাবারের দামও বেশি। একই সঙ্গে মানুষেরও কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে।
এই চরের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, শহরে থাকার জায়গা পাওয়া কঠিন। তার ওপর গরু-ছাগল রাখারও জায়গা নেই। নিজেরাই যখন খাবারের সংকটে, তখন গবাদিপশুর খাবার জোগাড় করা বড় চিন্তার বিষয়। চর খিদিরপুরে প্রায় দুই শতাধিক বাড়ি রয়েছে। পানি বাড়ায় এসব পরিবারের অনেকেই শহরের দিকে চলে গেছেন। একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চর খানপুর, মাঝারদিয়াড়, ১০ নম্বর চর ও চর আষাড়িয়াদহের বিভিন্ন এলাকায়।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, চর খিদিরপুরে পানি ওঠায় প্রায় ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে প্রায় ২৫ ধরনের পণ্য রয়েছে। বন্যাকবলিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চর ও মাঝারচরসহ তিনটি স্থানে মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও তাঁদের গবাদিপশুর জন্য আপাতত ভ্রাম্যমাণভাবে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। চর খিদিরপুরে প্রায় ১০ ফুট উঁচু দুটি বড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখানে মানুষের পাশাপাশি কয়েক হাজার গবাদিপশু রাখার সুযোগ থাকবে। পদ্মার পানি আপাতত বিপদসীমার নিচে থাকলেও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। একদিকে পানিতে ডুবে যাচ্ছে বসতভিটা ও চলাচলের পথ, অন্যদিকে হরিপুরের বেড়পাড়ায় নদীতীরের ব্লক সরে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা। স্থানীয় বাসিন্দাদের এখন একটাই দাবি—পানি আরও বাড়ার আগেই নদীতীর রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজশাহী মহানগরীর মন্নুজান স্কুলের সামনে গরুর চাকার আদলে নির্মিত ফুটওভার ব্রিজে সামান্য ফাটল দেখা দিয়েছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরা হলে তা রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটনের নজরে আসে। সে পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন সরেজমিনে ফুটওভার ব্রিজটি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি ব্রিজের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং ফাটলের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। পরিদর্শনকালে রাসিক প্রশাসক সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ফাটলটি দ্রুত মেরামতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন।
ঘরে খাবার আছে, রান্না করার মতো কোন জায়গা নেই
৭৫ বছর বয়সী আকলিমা বেগম। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টা। ঘরে খাবার আছে, কিন্তু রান্না করার মতো কোনও জায়গা নেই। পানিতে তলিয়ে গেছে। পেট আছে খেতে হবে। কোনও উপায় নেই। ঘরের বাইরে পানির মধ্যে একটি চকি রাখা আছে। এই চকির উপরে দুপুরের খাবারের রান্নার ব্যবস্থা করতে দেখা গেছে আকলিমা বেগম নামের এক বৃদ্ধাকে। আকলিমা বেগম কালিদাসখালী চরের একজন বাসিন্দা। আকলিমা বেগমের মতো অনেকেই রান্না করার জায়গা না পেয়ে, না খেয়ে দিন পার করছেন।
জানা গেছে, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মার মধ্যে চকরাজাপুর ইউনিয়নের চকরাজাপুর, কালিদাসখালী, লক্ষীনগর, দাদপুর, নিচ পলাশি, পলাশি ফতেপুর, আতারপাড়ায়, চৌমাদিয়ায়া, দিয়ারকাদিরপুরসহ ১৫টি চরে ১ হাজার ২০০ পরিবারে ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া ফলাশি ফতেপুর, চৌমাদিয়া, আতারপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মসজিদ পদ্মা গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। তারা অন্যস্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, বিদ্যালয়ে যাওয়ার কোন পরিস্থিতি নেই, তাই পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। এ বিদ্যালয়ে ৯১ জন শিক্ষার্থী ও ৩ জন শিক্ষক রয়েছে।
বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তকী ফয়সাল তালকদার বলেন, নদী ভাঙন ও বন্যার বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পানিবন্দিদের সহযোগিতার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে হু হু করে বাড়ছে পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি। টানা সাত দিনের পানি বৃদ্ধিতে জেলার সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার নদীতীরবর্তী পাঁচটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও ঘরের আঙিনা, কোথাও বসতঘরের আশপাশে পানি জমেছে। তলিয়ে গেছে আমন-আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও শাকসবজির ক্ষেত। প্লাবিত হয়েছে ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রশাসনের হিসাবে ইতোমধ্যে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার। এর মধ্যে সদর উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ এবং শিবগঞ্জে ৭০০ পরিবার রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, আপাতত তিন নদীর কোনোটি বিপদসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা নেই। পূর্বাভাস অনুযায়ী শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত পানি বাড়তে পারে, এরপর কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ এরই মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে যাতায়াত, বিশুদ্ধ পানি, রান্না, গবাদিপশু ও ফসল রক্ষা নিয়ে। ফলে বড় বন্যার আশঙ্কা না থাকলেও প্রশ্ন উঠেছে, পানি আরও বাড়লে নিম্নাঞ্চলের এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে কতটা দ্রুত সহায়তার আওতায় আনা যাবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) পদ্মার পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ২১ দশমিক ৭৬ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ২২ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপদসীমার মাত্র ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি বেড়েছিল ১১ সেন্টিমিটার।
শুধু পদ্মা নয়, জেলার অন্য দুই প্রধান নদী মহানন্দা ও পুনর্ভবার পানিও বাড়ছে। মহানন্দার খালঘাট গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ১৯ দশমিক ৪৩ মিটার। এ নদীর বিপদসীমা ২০ দশমিক ৫৫ মিটার। অন্যদিকে পুনর্ভবার রহনপুর গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ১৯ দশমিক ৪৬ মিটার, বিপদসীমা ২১ দশমিক ৫৫ মিটার। গত ২৪ ঘণ্টায় মহানন্দা ও পুনর্ভবা, দুই নদীতেই পানি বেড়েছে ১০ সেন্টিমিটার করে।
পদ্মার পানি বাড়ায় সদর চাঁপাইনবাবগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর, পাঁকা ও চরাঞ্চলের নিম্নভূমিতে পানি ঢুকেছে। শিবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়নের চরপাঁকা, লক্ষ্মীপুর ও নতুনপাড়া এলাকায় বেশ কিছু বসতবাড়িতে পানি ঢোকার খবর পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ ভবনসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কথাও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাজির হোসেন জানান, পদ্মায় পানি দ্রুত বাড়ছে। এখনও সব এলাকায় বাড়িঘর ও রাস্তায় পানি ঢোকেনি। তবে কয়েকটি স্থানে নদীভাঙন চলছে। পানি এভাবে বাড়তে থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের দুর্লভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম আজম জানান, ইউনিয়নের কয়েকটি নিম্নাঞ্চলে পানি ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু পাকা আউশ ধানখেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষকেরা দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, পানি বৃদ্ধির কারণে চরপাঁকা, লক্ষ্মীপুর ও নতুনপাড়া এলাকায় বেশ কিছু বাড়িতে পানি ঢুকেছে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
পানি বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩৬২ হেক্টর জমির আমন-আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও শাকসবজি পানিতে তলিয়ে গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আতিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। প্লাবিত এলাকার মানুষ গবাদিপশু, ঘরের জিনিসপত্র ও ফসল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সমস্যায় পড়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসাসহ ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার ইকরামুল হোসাইন জানান, পানিবন্দি মানুষের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশুদ্ধ পানি, রান্নার জায়গা, গবাদিপশুর খাদ্য ও চলাচল নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন তারা। অনেক পরিবার ঘরের মালামাল ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মূসা জঙ্গী বলেন, সদর উপজেলার প্রায় ১ হাজার ৮০০ এবং শিবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৭০০ পরিবারসহ মোট আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে চাল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ধাপে ধাপে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, উজানে ভারত থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টির পানিতে জেলার নদ-নদীর পানি বাড়ছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত পানি আরও বাড়তে পারে। এরপর পানি কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে তিনটি নদীর পানিই বিপদসীমার নিচে থাকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।