বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত একটি এলএলপি (লো লিফট পাম্প) সেচ প্রকল্পে জমির মালিকানা ও স্থাপনের স্থান নিয়ে গুরুতর অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নে ‘নদী থেকে পানি উত্তোলন এলএলপি’ নামে প্রকল্পটির জন্য যে জমির কাগজপত্র দেখিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, ভূমি অফিসের রেকর্ডে সেই জমির মালিকানা আবেদনকারীর নামে নেই। আবার বিএডিসির নথিতে দেখানো জমিতে প্রকল্পের স্থাপনা না করে পাশের রেলওয়ের সম্পত্তিতে পাকা ঘর নির্মাণ করে এলএলপি স্থাপন করা হয়েছে।
২০২৩ সালে বিএডিসি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জমির কাগজপত্র যাচাই এবং প্রস্তাবিত স্থানে সরেজমিন পরিদর্শনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের থাকলেও নথি ও বাস্তব অবস্থানের এই পার্থক্য কীভাবে ধরা পড়েনি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পটির স্কিম ম্যানেজার বাবলু প্রামাণিক। তার নামে এলএলপি স্থাপনের জন্য যে জমির কাগজপত্র বিএডিসিতে দাখিল করা হয়েছে, ভূমি অফিসের রেকর্ডে ওই জমির মালিক হিসেবে বাবলু প্রামাণিকের নাম পাওয়া যায়নি।
ভূমি অফিসের নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দাগের জমির পূর্ববর্তী মালিক ছিলেন বদিউজ্জামান ও শামছুজ্জামান। তাদের অবর্তমানে আসাদুল, খায়রুল, বিলকিস, জরিনা, হাসনাতুজ্জামান ও আমিরুল ইসলাম জমিটির মালিক হন। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বর্তমান মালিকরা জমিটির মিউটেশন সম্পন্ন করেন। এরপর জমিটি বাবলু প্রামানিকের কাছে হস্তান্তর কিংবা তার নামে মিউটেশনের কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পঞ্চক্রোশী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা ওয়াহিদ সাদিক আমরুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভূমি অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা বাবলু প্রামাণিকের নামে নেই।’
অপরদিকে, বিএডিসির নথিতে যে দাগের জমি দেখানো হয়েছে, সরেজমিনে মাটিকোড়া এলাকায় গিয়ে সেখানে এলএলপির কোনও স্থাপনা পাওয়া যায়নি। নথিতে উল্লেখ করা জমির পাশেই রেলওয়ের সম্পত্তিতে পাকা ঘর নির্মাণ করে সেখানে এলএলপিটি স্থাপন করা হয়েছে।
ফলে প্রকল্পটির অনুমোদনে একদিকে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র, অন্যদিকে এলএলপি স্থাপনের স্থান—দুই ক্ষেত্রেই নথির সঙ্গে বাস্তব অবস্থানের পার্থক্য পাওয়া গেছে। এতে অনুমোদনের আগে বিএডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জমির কাগজপত্র ও প্রকল্পের প্রস্তাবিত স্থান যথাযথভাবে যাচাই করেছিলেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিএডিসির কর্মকর্তারা যথাযথভাবে নথি যাচাই ও সরেজমিন পরিদর্শন করলে জমির মালিকানা এবং এলএলপির অবস্থান—দুই ধরনের অসংগতিই ধরা পড়ার কথা। তৎকালীন উল্লাপাড়া উপজেলা বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী জাহিদ হাসান ও উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম এলএলপিটির অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
এলএলপি স্কিমের ম্যানেজার বাবলু প্রামাণিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তখনকার কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করেই আমাকে অনুমোদন দিয়েছেন।’
এ ব্যাপারে বিএডিসির সিরাজগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী চিত্তরঞ্জন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পূর্ণ উপজেলার সহকারী প্রকৌশলীর হাতে। তিনি যাচাই-বাছাই করার পর ইউএনও অনুমোদন দেন।’
বিএডিসির উল্লাপাড়া জোনের সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি কয়েক দিন আগে উল্লাপাড়া থেকে অন্য স্থানে বদলি হয়েছি। এমতাবস্থায় অফিসিয়াল বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়। তবে সরকারি সম্পত্তিতে ওই দফতরের অনাপত্তি ছাড়া বিএডিসির কোনও প্রকল্প স্থাপন করা সম্পূর্ণ বেইআইনি।’
রেলের সম্পত্তিতে সরকারি স্কিম স্থাপনের বিষয়ে পাকশী বিভাগীয় ব্যবস্থাপক লিয়াকত আলী খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। এরপর বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’