বিলের প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেয়ালচিত্রে শিক্ষার নতুন পাঠ

বর্ষায় চারদিকে পানি, যোগাযোগে নানা প্রতিকূলতা। চলনবিলের প্রত্যন্ত জনপদে শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়মুখী করা দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিদ্যালয়ের পরিবেশকে আকর্ষণীয় করে তুলছেন শিক্ষকরা। বইয়ের বাইরের শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে বিদ্যালয়ের দেয়াল সাজানো হয়েছে বর্ণমালা, ছড়া, পশু-পাখি, কবি ও বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি এবং নানা শিক্ষামূলক বার্তায়। ফলে দেয়ালগুলোই যেন হয়ে উঠেছে শিক্ষার পুঁথি।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বিল অধ্যুষিত উধুনিয়া, মোহনপুর ও বড়পাঙ্গাসী ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে এমন চিত্র। দত্তখারুয়া, মোহনপুর, চরমোহনপুর, চণ্ডিপুর, ভাতবাড়া মামুদপুর, পংখারুয়া ও ওলিদহসহ কয়েকটি বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দেয়ালজুড়ে রয়েছে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, ইংরেজি বড় ও ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা ও নানা ছড়া। অক্ষর দিয়ে আঁকা হয়েছে হাতি, ঈগল, বিভিন্ন পশু-পাখি, একতারা ও শহীদ মিনারের ছবি। কোথাও ফুটে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের নানা দৃশ্য।

দেয়ালে লেখা হয়েছে শিক্ষামূলক বিভিন্ন নীতিকথাও। ‘শিক্ষিত মা এক সুরোভিত ফুল, প্রতিটি ঘর হবে একেকটি স্কুল’ এবং ‘মেধাই মানুষের বড় সম্পদ’-এর মতো বার্তা শিশুদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন করছে। ছবিসহ তুলে ধরা হয়েছে বিশ্বকবি, জাতীয় কবি ও বীরশ্রেষ্ঠদের পরিচিতিও।

বিদ্যালয়গুলোর বারান্দায় টবে লাগানো হয়েছে নানা ধরনের ফুল। পরিচ্ছন্নতা ও নান্দনিক পরিবেশের সঙ্গে শিক্ষামূলক দেয়ালচিত্র যুক্ত হওয়ায় পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পেয়েছে ভিন্ন আবহ। শিক্ষকদের দাবি, এতে শিশুদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ বাড়ছে এবং পড়াশোনার প্রতি মনোযোগও তৈরি হচ্ছে।

উধুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হারুন-অর রশিদ বলেন, শিক্ষকদের সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি সাজানো হয়েছে। সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। বিদ্যালয়ে তারা শিক্ষার পাশাপাশি আনন্দময় পরিবেশও পাচ্ছে।

পংখারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রহমতুল বারী বলেন, পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে শিক্ষকরা কাজ করছেন। এ কাজে এলাকাবাসী ও অভিভাবকরাও সহযোগিতা করছেন। সুন্দর পরিবেশ তৈরি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে এবং পড়াশোনার মানও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক জানান, বিদ্যালয়ের দেয়ালে আঁকা ছবি ও লেখা শিশুদের সহজেই আকৃষ্ট করছে। অনেক শিশু স্কুলে শেখা বিষয়গুলো বাড়িতেও আলোচনা করছে। এতে বিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের এক ধরনের আনন্দের সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

উল্লাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উপজেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নতুন রূপে সাজানোর চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের স্কুলভীতি দূর করে বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহী করা হচ্ছে। শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রাথমিক শিক্ষায় উল্লাপাড়া উপজেলা একটি রোল মডেল হবে বলে আশা করেন তিনি।

চলনবিলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার পথে প্রতিকূলতা এখনও আছে। তবে সেই বাস্তবতায় বিদ্যালয়কে শুধু পাঠদানের জায়গা না রেখে আনন্দ ও শেখার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার এই উদ্যোগ শিশুদের স্কুলমুখী করার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বইয়ের পাঠের সঙ্গে দেয়ালের ছবি ও লেখার এই মেলবন্ধন হয়ে উঠছে তাদের নীরব শিক্ষাসঙ্গী।