মরুভূমি অঞ্চলের প্রাণী দুম্বা। সুঠাম দেহ আর ভরপুর মাংসের জন্য কোরবানির ঈদে যেমন এর চাহিদা বাড়ে, তেমনি বছরজুড়েও ক্রেতা খুঁজে পান খামারিরা। দেশীয় গরু-মহিষের তুলনায় দুম্বা পালনে বেশি লাভের সম্ভাবনা দেখে নাটোরের গুরুদাসপুরে ৩২ বিঘা জমিতে বিশাল খামার গড়ে তুলেছেন হান্নান সরকার। তার খামারে এখন বিক্রির উপযোগী দুম্বা রয়েছে ৬০টি। আকার ও গঠনভেদে প্রতিটির দাম ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকারও বেশি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতারা আসছেন দুম্বা কিনতে।
চাপিলা ইউনিয়নের খামারপাথুরিয়া গ্রামের এই খামারি একসময় দেশি ছাগল ও গরু পালন করতেন। পরে ব্যতিক্রম কিছু করার চিন্তা থেকে খামারে যুক্ত করেন মরু অঞ্চলের গারল। তাতে সম্ভাবনা দেখে একসময় দুম্বা পালনে আগ্রহী হন তিনি। মাত্র ৩০টি দুম্বা দিয়ে শুরু করা খামারটি এখন বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। গত কোরবানির ঈদে অন্তত ৪০টি দুম্বা বিক্রি করেছেন হান্নান।
গরু-ছাগল ছেড়ে দুম্বায়
২০১০ সালের দিকে দেশি ছাগল পালনের মধ্য দিয়ে খামারি জীবন শুরু করেন হান্নান সরকার। পরে গরু পালনও শুরু করেন। কিন্তু এলাকায় গরু-ছাগলের অনেক খামার থাকায় এ খাতে তেমন সম্ভাবনা দেখেননি তিনি। এরপর ভিন্ন কিছু করার চিন্তা থেকে খামারে যুক্ত করেন মরু অঞ্চলের গারল। এতে আশার আলো দেখতে পেয়ে পরে দুম্বা পালনের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে ভারত থেকে ৩০টি দুম্বা আনেন তিনি। লাভের মুখ দেখায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে খামারের পরিধি। বর্তমানে ৩২ বিঘা জমিতে গড়ে উঠেছে তাঁর বিশাল দুম্বার খামার। খামারে এখন বিক্রয়যোগ্য দুম্বার সংখ্যা ৬০টি।
হান্নান সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার খামারে বর্তমানে ৪০টির বেশি দুম্বা বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আকার ভেদে ন্যূনতম ১ লাখ টাকা থেকে দুম্বার দাম হাঁকা হচ্ছে। সর্বোচ্চ দাম উঠছে ৩ লাখের বেশি। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে খামারে ক্রেতা আসছেন দুম্বা কেনার জন্য।’
দুম্বা পালনের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘খামারটিতে যখন দুম্বা পালন শুরু করেছিলাম, তখন মানুষ নানা কটু কথাও বলেছেন। তেমন সাড়াও মেলেনি। তবে আমি ধৈর্য হারাইনি। এখন বছরজুড়েই দুম্বা বিক্রি করছি। তবে কোরবানি এলে দুম্বার চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুণে। আবার ভিনদেশি এই প্রাণীটিকে দেখতে ভিড় জমান উৎসুক মানুষ। সব মিলিয়ে দুম্বা খামারে আমার আনন্দের মধ্যে দিন কাটে।’
হান্নান সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাকে দেখে অনেকেই এখন দুম্বা পালনে আগ্রহী হয়েছেন। তার খামার থেকে দুম্বা কিনে কেউ কেউ স্বল্প পরিসরে খামার গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। গত কোরবানিতে অন্তত ৪০টি দুম্বা বিক্রি করে বড় অঙ্কের মুনাফা পেয়েছেন তিনি। দুম্বা কেনায় ক্রেতাদের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।
৩২ বিঘার খামারে কর্মসংস্থান ২৩ জনের
বড় পরিসরের এই খামারে দুম্বার নিয়মিত পরিচর্যায় নিয়োজিত রয়েছেন ২৩ জন কর্মচারী। প্রাণীগুলোর খাবারের জোগান নিশ্চিত করতে নিজেই প্রায় ৭ বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করেছেন হান্নান সরকার।
খামারের জমিতে উৎপাদিত তাজা ঘাস কেটে দুম্বাগুলোকে খাওয়ানো হয়। পাশাপাশি প্রতিদিন দুই বেলা দেওয়া হয় খড় ও ভুসি। প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানোর কারণে দুম্বা ভেতর থেকে শক্তিশালী হয় এবং মাংসও সুস্বাদু হয় বলে জানান খামারি।
খামারের পুরোনো শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুম্বার খামারে কাজ করা বেশ আনন্দের। প্রায় সবসময়ই ক্রেতা অথবা দর্শনার্থী থাকে। আমি এক দশক ধরে হান্নানের খামারে দুম্বার পরিচর্যায় নিয়োজিত আছি। পশুগুলোকে রোগমুক্ত রাখতে বাড়তি যত্ন নিই আমরা।’
এক খামারেই বাড়ছে চাহিদা
স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, নাটোর অঞ্চলের মধ্যে হান্নান সরকারের এটিই একমাত্র দুম্বার খামার। তাঁর খামারের দুম্বার ক্রেতা এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রায় প্রতিদিনই নানা শ্রেণিপেশার মানুষ দুম্বা কিনতে ছুটে আসছেন গুরুদাসপুরের এই খামারে।
গত কোরবানিতে দুম্বা বিক্রি করে বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জনের পর খামারটির প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে। পাশাপাশি হান্নানের খামার দেখে অন্যরাও দুম্বা পালনে উৎসাহিত হচ্ছেন।
বাংলাদেশের আবহাওয়াতেও সম্ভাবনাময় দুম্বা
দুম্বা মূলত গ্রীষ্মপ্রধান ও শুষ্ক অঞ্চলের প্রাণী। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়াতেও এর বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা।
নাটোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুম্বা মূলত গ্রীষ্মপ্রধান ও শুষ্ক অঞ্চলের প্রাণী। তবে এটি বাংলাদেশের সহনশীল আবহাওয়াতেও বেড়ে উঠছে। বিশেষ করে রোদের তাপমাত্রা বাড়ায় দুম্বা আরও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিসের মাধ্যমে গুরুদাসপুরে বাণিজ্যিক দুম্বা খামারে সার্বক্ষণিক নানা পরামর্শ দেওয়া হয়।’
মরু অঞ্চলের প্রাণী দুম্বাকে ঘিরে নাটোরের গুরুদাসপুরে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। হান্নান সরকারের ৩২ বিঘার খামারে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাড়ছে ক্রেতাদের আগ্রহ। দেশীয় গরু-ছাগলের পাশাপাশি দুম্বা পালনও যে লাভজনক বাণিজ্যিক খাতে পরিণত হতে পারে, হান্নানের খামার তারই উদাহরণ।