ছাত্রদল নেতা হত্যাকাণ্ড

হত্যার হুমকি পেয়ে ছেলে থানায় জিডি করেছিল, বাঁচাতে পারেনি পুলিশ: শাকিলের বাবা

নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে গত ২০ এপ্রিল ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন নাটোরের গুরুদাসপুর পৌরসভা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২)। এ ঘটনার প্রায় ছয় মাসের মাথায় পৌরসভার চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় তাকে কুপিয়ে আহত করা হয়। এর ১২ দিন পর সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ওই ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয় আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে। যারা আমাকে মারতে পারবে, তাদের নাকি অনেকগুলো টাকা দেওয়া হবে। এই বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটা ডায়েরি (সাধারণ ডায়েরি) করেছি এবং তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে এই জিডি অনুযায়ী মামলা করে দেবেন।’

এই পোস্টের বিষয়ে নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে সবকিছু মাথায় রেখে তদন্ত চলছে বলে তিনি জানান।

বাঁচাতে পারেনি পুলিশ

শাকিলের বাবা রবিউল করিম বলেন, ‘হত্যার হুমকি পাওয়ার পর আমার ছেলে থানায় জিডি করেছিল। অথচ শাকিলকে বাঁচাতে পারেনি পুলিশ। আবার খুন হওয়ার পরও অপরাধী ধরতে পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ছিল। আমি ছেলে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। এই হত্যার ঘটনায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত আছে।’

এমপির ছেলে রিমান্ডে

এদিকে শাকিল হত্যায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে নাটোর-৪ আসনের (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) বিএনপির সংসদ সদস্য (এমপি) আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুকে। তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকাল ৫টার দিকে নাটোরের গুরুদাসপুর আমলি আদালতে হাজির করা হলে তার রিমান্ডের আদেশ দেন বিচারক। 

এর আগে সোমবার গভীর রাতে হেফাজতে নিয়ে নূরুজ্জামান মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে তাকে আদালতে তোলা হয়। তবে হত্যা মামলার রিমান্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেও আদালত থেকে বের করার সময় এমপিপুত্রের হাতে হাতকড়া পরায়নি পুলিশ। পরে তাকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়।

এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন আদালত পুলিশের পরিদর্শক আসমাউল হক। তিনি বলেন, ‘হত্যা মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে আসামির বিরুদ্ধে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষের আদালত আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নাটোর জজ আদালতের আইনজীবী মুক্তার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতে আসামির পক্ষে কোনও আইনজীবী ছিলেন না। তবে আসামি নিজেই শুনানি করার জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চান। আদালত অনুমতি দিলে মিন্টু বলেছেন, তিনি এই হত্যার সঙ্গে জড়িত নন। পুলিশ কোনও কিছু যাচাই না করেই তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে। তিনি সঠিক তদন্ত চান। এ সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেছেন, “হত্যাকাণ্ডটি চাঞ্চল্যকর। প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় আসামির বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে সাহস পাচ্ছেন না।” হত্যার সঠিক রহস্য উদঘাটনের জন্য আসামিকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া দরকার। এই সময় আদালত শুনানি শেষে আসামি মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।’

এর আগে সোমবার রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুর বাজার সংলগ্ন ভাড়া বাড়ি থেকে মিন্টুকে আটক করে গুরুদাসপুর থানা পুলিশ। পরে মঙ্গলবার দুপুরে তাকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। নুরুজ্জামান মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।

ডিবি হেফাজতে মিন্টু

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সোমবার দিবাগত রাতে থানা মিন্টুকে আটক করে রাত ১২টার দিকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে মিন্টুকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে রিমান্ড মঞ্জুর করার পর তাকে আবারও ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’

নিহত শাকিল ইসলাম গুরুদাসপুর পৌরসভার খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া এলাকার রবিউল করিমের ছেলে। তিনি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন। গত ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় চাঁচকৈড় বাজার থেকে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন শাকিল। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখান থেকে রাজশাহী ও পরে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিক্যাল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছিলেন তার বাবা রবিউল করিম। সেই মামলায় নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত শাকিল রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসার পর সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মারা যান। মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর ওই হাসপাতালেই কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতির নেতৃত্বে এমপি আবদুল আজিজকে অবরুদ্ধ করা হয়।

সেখানে তার বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার ও নিহত শাকিলের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান নেতাকর্মীরা। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই রাত ১০টার দিকে মিন্টুকে আটক করে মধ্যরাত পর্যন্ত গুরুদাসপুর থানায় ওসির কক্ষে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাতেই তাকে নাটোর জেলা ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। 

মঙ্গলবার সকালে শাকিলের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে যান সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। এ সময় তিনি বলেন, অপ্রত্যাশিত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সন্তান জড়িত থাকলে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।

এ সময় সংসদ সদস্য ও ওসির উপস্থিতিতে নিহত শাকিলের বাবা রবিউল করিম অপরাধীদের গ্রেফতারে পুলিশের অবহেলার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে আসামি ধরতে পুলিশের চরম অবহেলা ছিল। স্থানীয় নেতাকর্মীরাও এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। তিনি মামলার এজাহারে নাম উল্লেখ করে দিলেও এজাহারটি অজ্ঞাতনামা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

এমপির দুই ছেলের দুই গ্রুপের বিরোধ

স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগ উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সম্পাদক। এমপির দুই ছেলের পৃথক দুটি গ্রুপ ও সমর্থক গোষ্ঠী আছে। দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্বও আছে দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে ছাত্রদল নেতা শাকিল এমপির ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের অনুসারী ছিলেন। 

এ বিষয়ে নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সবকিছু মাথায় রেখে তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদের গ্রেফতার করা হবে।’