ছাত্রদল নেতা হত্যাকাণ্ড

বিএনপির এমপির ছেলে ৩ দিনের রিমান্ডে, পক্ষে দাঁড়াননি কোনও আইনজীবী

নাটোর প্রতিনিধি
২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৪৮ আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৩৫

ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম (৩২) হত্যায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার নাটোর-৪ আসনের (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) বিএনপির সংসদ সদস্য (এমপি) আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকাল ৫টার দিকে নাটোরের গুরুদাসপুর আমলি আদালতে হাজির করা হলে তার রিমান্ডের আদেশ দেন বিচারক। 

এর আগে সোমবার গভীর রাতে হেফাজতে নিয়ে নূরুজ্জামান মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে তাকে আদালতে তোলা হয়। তবে হত্যা মামলার রিমান্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেও আদালত থেকে বের করার সময় এমপিপুত্রের হাতে হাতকড়া পরায়নি পুলিশ। পরে তাকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়।

এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন আদালত পুলিশের পরিদর্শক আসমাউল হক। তিনি বলেন, ‘হত্যা মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে আসামির বিরুদ্ধে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষের আদালত আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নাটোর জজ আদালতের আইনজীবী মুক্তার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতে আসামির পক্ষে কোনও আইনজীবী ছিলেন না। তবে আসামি নিজেই শুনানি করার জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চান। আদালত অনুমতি দিলে মিন্টু বলেছেন, তিনি এই হত্যার সঙ্গে জড়িত নন। পুলিশ কোনও কিছু যাচাই না করেই তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে। তিনি সঠিক তদন্ত চান। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, “হত্যাকাণ্ডটি চাঞ্চল্যকর। প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় আসামির বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে সাহস পাচ্ছেন না।” হত্যার সঠিক রহস্য উদঘাটনের জন্য আসামিকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া দরকার। এই সময় আদালত শুনানি শেষে আসামি মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।’

এর আগে সোমবার রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুর বাজার সংলগ্ন ভাড়া বাড়ি থেকে মিন্টুকে আটক করে গুরুদাসপুর থানা পুলিশ। পরে মঙ্গলবার দুপুরে তাকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। নুরুজ্জামান মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সোমবার দিবাগত রাতে মিন্টুকে আটক করে রাত ১২টার দিকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে মিন্টুকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করার পর তাকে আবার ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’

নিহত শাকিল ইসলাম গুরুদাসপুর পৌরসভার খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া এলাকার রবিউল করিমের ছেলে। তিনি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব ছিলেন। গত ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় চাঁচকৈড় বাজার থেকে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন শাকিল। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখান থেকে রাজশাহী ও পরে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিক্যাল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছিলেন তার বাবা রবিউল করিম। সেই মামলায় নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত শাকিল রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসার পর সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মারা যান। তার মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর ওই হাসপাতালেই কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতির নেতৃত্বে এমপি আবদুল আজিজকে অবরুদ্ধ করা হয়। সেখানে তার বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার ও নিহত শাকিলের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান নেতাকর্মীরা। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই রাত ১০টার দিকে মিন্টুকে আটক করে মধ্যরাত পর্যন্ত গুরুদাসপুর থানায় ওসির কক্ষে বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাতেই তাকে নাটোর জেলা ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। 

মঙ্গলবার সকালে শাকিলের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে যান সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। এ সময় তিনি বলেন, অপ্রত্যাশিত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সন্তান জড়িত থাকলে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।

এ সময় সংসদ সদস্য ও ওসির উপস্থিতিতে নিহত শাকিলের বাবা রবিউল করিম অপরাধীদের গ্রেফতারে পুলিশের অবহেলার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে আসামি ধরতে পুলিশের চরম অবহেলা ছিল। স্থানীয় নেতাকর্মীরাও এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। তিনি মামলার এজাহারে নাম উল্লেখ করে দিলেও এজাহারটি অজ্ঞাতনামা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

সেদিন যা ঘটেছিল

পুলিশ ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন ছাত্রদল নেতা শাকিল। এ সময় শাকিলকে কুপিয়ে জখম করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।

সেদিন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে শাকিল বলেছিলেন, চাঁচকৈড় বাজার থেকে রাত ৯টার দিকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। বাজারপাড়া এলাকার নুর অ্যাকাডেমির কাছে পৌঁছালে হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলি থেকে বাঁচতে দৌড় দেন। গুলি গায়ে না লাগায় দুর্বৃত্তরা তার পেছনে ধাওয়া করে। পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির সামনে এলে দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসার আগেই মোটরসাইকেল নিয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী সুমন রহমান জানান, বাজারপাড়ার শহীদা জলিল স্কুলের কাছে পর পর দুটি গুলি শব্দ শুনতে পান তারা। এগিয়ে যেতেই শাকিলকে দৌড়ে চলে যেতে দেখেন। পেছনে মোটরসাইকেল নিয়ে ধাওয়া করে দুই ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পর রক্তমাখা অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীদের ফিরতে দেখেন। পরে শহীদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে চিৎকার করছিলেন শাকিল। তারা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

গুরুতর আহত অবস্থায় শাকিলকে উদ্ধার করে প্রথমে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে পাঠানো হয়।

তখন গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক নওশিন জাহান বলেছিলেন, ‘গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত করা হয়। শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় চিকিৎসা শেষে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’

যুবদল নেতা ইসরাফিল শেখ বলেন, ‘হামলার রাতেই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে শাকিলকে অন্তত পাঁচ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। এরপর অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অপারেশনের পর অবস্থার অবনতি হলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার কিডনি কাজ করছিল না। শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় ওই হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে নেওয়া হয়। আইসিইউতে রাখার পর লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। সবশেষ সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড তদন্ত করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। অপরাধী যত বড় প্রভাবশালী হোক না কেন পুলিশ ছাড় দেবে না।’

শাকিলের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় রাজধানীর নয়া পল্টন এলাকায় বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে নিহত শাকিলের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর এশার নামাজের পর বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে তাকে চাঁচকৈড় পুড়ানপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হবে।

/এএম/এমওএফ/ 
সম্পর্কিত
১২ জনের মৃত্যু: ফিটনেস ছাড়াই কীভাবে চলছিল বাসটি, জানে না বিআরটিএ
যাত্রাবাড়ীতে তরুণকে গুলি করে হত্যা
ছাত্রদল নেতা হত্যাকাণ্ড হত্যার হুমকি পেয়ে ছেলে থানায় জিডি করেছিল, বাঁচাতে পারেনি পুলিশ: শাকিলের বাবা
সর্বশেষ খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
জননিরাপত্তায় আইজিপির বক্তব্য সময়োপযোগী: পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন
জননিরাপত্তায় আইজিপির বক্তব্য সময়োপযোগী: পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন
সৌদির ৪ স্থানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি হুথিদের
সৌদির ৪ স্থানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি হুথিদের
সাংবাদিক না হয়েও গাড়িতে ‘প্রেস’, ৫২০০ ইয়াবাসহ গ্রেফতার
সাংবাদিক না হয়েও গাড়িতে ‘প্রেস’, ৫২০০ ইয়াবাসহ গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো আরেক পোশাক কারখানা
অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো আরেক পোশাক কারখানা
২১ লাখ ফলোয়ার, ভোট পেলেন মাত্র ৩৩টি
২১ লাখ ফলোয়ার, ভোট পেলেন মাত্র ৩৩টি
এ বছর শীতের তীব্রতা কেমন হবে
এ বছর শীতের তীব্রতা কেমন হবে
প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে, এরপর যা ঘটলো মাসুদের সঙ্গে
প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে, এরপর যা ঘটলো মাসুদের সঙ্গে
‘আপনাদের সম্মানি দিচ্ছি, ভিডিওগুলো ডিলিট করে দেন’
‘আপনাদের সম্মানি দিচ্ছি, ভিডিওগুলো ডিলিট করে দেন’