ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়েছে পাঁচ মাস আগে। অথচ বাসটি দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল মহাসড়ক। বেপরোয়া গতিতে চলতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পড়ে আরপি স্পেশাল পরিবহনের বাসটি। এতে ১২ জনের মৃত্যু হয়।
গত মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়া এলাকায় বাসটির সঙ্গে বালুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। বাসটি দুর্ঘটনার সময় চালাচ্ছিলেন এটির সুপারভাইজার সোহেল রানা। এ সময় চালক ও সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাচ্ছিলেন।
বাসটির ফিটনেস সনদ ছিল না
ফিটনেস ছাড়াই পাঁচ মাস ধরে মহাসড়কে চলছিল বাসটি। নাটোর বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৩ মে বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়। অথচ সেই বাসটির সড়কে চলাচলের অনুমোদন রয়েছে ২০২৮ সালের ১৩ মে পর্যন্ত। ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও শুধু সড়কে চলাচলের অনুমতির ভিত্তিতেই বাসটি কীভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফিটনেসবিহীন বাসটির সড়কে চলাচলের অনুমোদন থাকে কীভাবে তার জবাব দিতে পারেনি নাটোর বিআরটিএ।
বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক উত্তম কুমার দেবশর্মা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ফিটনেসবিহীন কোনও পরিবহনই মহাসড়কে চলাচল করার কোনও নিয়ম নেই। আরপি পরিবহনের বাসের ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবুও পাঁচ মাস ধরে কীভাবে বাসটি সড়কে চলাচল করছে, সেটি খতিয়ে দেখা হবে।
দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত শুরু
যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জন নিহতের ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। এর মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলায় ঘটনাটি তদন্ত করছে বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশ। এ ছাড়া দুর্ঘটনার সঠিক কারণ উদঘাটনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা তদন্ত কমিটিও তদন্ত শুরু করেছে।
বনপাড়া হাইওয়ে থানার উপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দুর্ঘটনার দিন আহত ও নিহতদের পক্ষ থেকে কেউ মামলা করেনি। শেষে মঙ্গলবার রাতে বড়াইগ্রাম থানায় সড়ক নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা করেন বনপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আকবর হোসেন। ওই মামলায় বাস ও ট্রাকের চালককে আসামি করা হয়েছে। তবে এজাহারে দুই চালকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। ইতিমধ্যে মামলাটির তদন্ত শুরু করেছে হাইওয়ে পুলিশ।’
এদিকে নাটোর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা তদন্ত কমিটিও কারণ অনুসন্ধান করছে। তদন্ত কমিটির প্রধান নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতের নেতৃত্বে গত বুধবার সকালে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে তদন্ত কমিটি।
এ সময় তদন্ত কমিটির সদস্য বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস, নাটোর সড়ক বিভাগের প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম, ফায়ার সার্ভিসের সহকারী উপপরিচালক আক্তার হামিদ, বিআরটিএর সহকারী পরিচালক উত্তম কুমার শর্মা, বড়াইগ্রাম সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্বপন চন্দ্র হোড়, বনপাড়া হাইওয়ে থানার ওসি আলমগীর হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াত বলেন, ‘দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ঘটনাস্থলের বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ফিটনেস, বেপরোয়া গতি, চালকের আসনে সুপারভাইজারের বাস চালানোসহ নানা বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখ করে নাটোরে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবো আমরা।’
দুর্ঘটনাটি যেভাবে ঘটলো
বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শ (এসআই) মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘বাসটি বরগুনা থেকে যাত্রী নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাচ্ছিল। ট্রাকটি পঞ্চগড় থেকে বালুবোঝাই করে ঝিনাইদহে যাচ্ছিল। বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রামের বনপাড়া সরকারপাড়া এলাকায় পৌঁছালে মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলে নয়জনের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন।’
তিনি বলেন, ‘ট্রাকটি মহাসড়কের বাম পাশের লেন ধরেই যাচ্ছিল। কিন্তু বেপরোয়া গতিতে ওভারটেকিং করতে গিয়ে ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে দুই পরিবহনের চালকই মারা গেছেন।’