নাম তাদের ‘ফালতু’ ‘সিংহাম’, এক জেলাতেই কিশোরদের ৩৫ গ্যাং

রাজশাহী নগরীর অলিগলি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ, পার্ক, লেক ও ফ্লাইওভার এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ছিনতাই, মারধর, সংঘবদ্ধ হামলা, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি ও মাদককেন্দ্রিক অপরাধের অভিযোগ উঠছে এসব দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে উত্ত্যক্ত করা, বেপরোয়া মোটরবাইক চালানো এবং দলবদ্ধভাবে মহড়া দেওয়ার ঘটনাও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান ও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি)। দুলাল আবদুল্লাহ, রাজশাহীতবে শুধু গ্রেফতার নয়, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের দেওয়া তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজশাহী নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডেই কিশোর অপরাধী চক্রের উপস্থিতি রয়েছে। সক্রিয় চক্রের সংখ্যা অন্তত ৩৫ এবং সদস্য পাঁচ শতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব চক্রের মধ্যে টেন স্টার বয়, রাইজিং বয়, অদম্য বালক, গলি বয়, হিটার বয়েজ, নেকসাস, মায়া, ফালতু, সিংহাম, প্লাস্টিক, ডি-হট বয় ও বুলেট গ্যাংয়ের নাম এসেছে।

তবে নাম প্রকাশে ইচ্ছুক না এমন একজন রাজশাহী নগরীর তরুণ বাসিন্দা জানান, একসময় পাড়া-মহল্লায় নিজের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ ধরনের নাম নিয়ে গ্রুপ গড়ে তোলা হয়। তারা প্রথমে জার্সি তৈরি বাইক নিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জানান দেয় তারা। বর্তমানে পুলিশের তৎপরতায় গ্রুপগুলো বিচ্ছিন্ন হয়। তবে নগরীর অনেক এলাকায় মাদকের নেশার অর্থ সংগ্রহের জন্য তা অব্যাহত রয়েছে। এরা বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে। এদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ, সিঅ্যান্ডবি সড়ক, বিমান চত্বর, পদ্মাপাড়, চিড়িয়াখানা, ভদ্রা পার্ক, লেক ও ফ্লাইওভার এলাকাকে কিশোরদের আড্ডা ও অপরাধপ্রবণতার সম্ভাব্য হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুই বছর আগে আরএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট পাঁচ শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যের তথ্যভান্ডার তৈরি করেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নিয়মিত নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রাজশাহীর বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসি মাছুমা মোস্তারী জানান, কিশোর গ্যাং, ইভটিজিং, যৌন হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা যেকোনও ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরএমপির তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে পথচারী ও যানবাহন থামিয়ে মারধর, টাকা ছিনিয়ে নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা। গত ৩ জুলাই শাহ মখদুম থানা এলাকায় সিটিহাটগামী একটি অটোরিকশার গতিরোধ করে চালককে মারধর ও তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় করা মামলায় পুলিশ ছয় জনকে গ্রেফতার করে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।

গত ১৯ মে কোর্ট একাডেমি স্কুল ছুটির সময় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে মারধরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ দুই কিশোরকে গ্রেফতার করে। একই মাসে কাশিয়াডাঙ্গায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোরদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। এর কয়েক দিন পর চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে অর্ধশতাধিক কিশোর সরকারি কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের বাড়িতে ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ ওঠে।

নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গত ২ আগস্ট বোয়ালিয়া থানা এলাকার কালুমিস্ত্রির মোড়ে এক অনার্সপড়ুয়া ছাত্রীকে যৌন হয়রানি, অশালীন কথাবার্তা, ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে তিন জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা ওই ছাত্রী, তার পরিবারের সদস্য এবং রাজশাহীতে পড়তে আসা অন্য শিক্ষার্থীদেরও হুমকি দিয়ে আসছিল। এ ঘটনায় ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আরএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসে বিষয়টি। অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত থাকার কথাও জানিয়েছিল পুলিশ।

আরএমপির মুখপাত্র উপকমিশনার গাজীউর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১২ কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে পাঁচ জন শিশু।

তার ভাষ্য, নগরীতে বড় আকারের কিশোর গ্যাং না থাকলেও একই বয়সী ছেলেরা এলাকাভিত্তিক দল বেধে আড্ডা দেয়। এদের কেউ কেউ স্কুল-কলেজপড়ুয়া মেয়েদের একা পেলে অশালীন মন্তব্য করে পালিয়ে যায়।

পুলিশের এ কর্মকর্তা আরও জানান, কয়েকটি মেসেঞ্জার গ্রুপ শনাক্ত করে নজরদারি করা হচ্ছে। অভিভাবকদের সন্তানদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক সভাও করা হয়েছে। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকানোই পুলিশের মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

এদিকে গত ২৭ সেপ্টেম্বর নগরীর বাকির মোড়ে টাকা ভাঙানো নিয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে এক দোকানদারকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা নগরবাসীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। 
স্থানীয়দের কেউ কেউ আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব ও ছিনতাইকে কেন্দ্র করে কিশোর-তরুণদের সংঘবদ্ধ চলাফেরার কথা বলছেন। তবে ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা ও সেবন এবং ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তার মতে, এসব কর্মকাণ্ড নগরবাসীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি শান্তির শহর হিসেবে রাজশাহীর সুনাম ক্ষুণ্ন করছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুন্সী ইসরাইল হোসেনের মতে, কিশোর অপরাধ কেবল আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়; এর সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতাও জড়িত। শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের নিবিড় নজরদারি বাড়াতে হবে।
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে তাই নিয়মিত অভিযান ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সচেতনতা, মাদক থেকে দূরে রাখার উদ্যোগ এবং অভিভাবক-শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা জরুরি। একই সঙ্গে এসব চক্রের পেছনে প্রাপ্তবয়স্ক বা প্রভাবশালী কারও পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে তা তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়—সমন্বিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রসঙ্গে বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে উপজেলা পরিষদ হলরুমে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় পবা-মোহনপুর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন বলেছেন, পুলিশ বর্তমানে অনেকটা অসহায় অবস্থায় রয়েছে এবং ইতিমধ্যে দুইবার তাদের পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে শুধু পোশাক পরিবর্তন করলেই হবে না, কাজের ও মানসিকতারও পরিবর্তন করতে হবে।

পুলিশ ছাড়া রাষ্ট্র চলতে পারে না উল্লেখ করে তিনি পুলিশ সদস্যদের মানসিকভাবে পরিবর্তন এনে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান।

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ‘ম্যাগনেট গ্রুপ’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা চোরাই পথে দেশত্যাগ করেনি, বরং সরকারিভাবেই চার্টার্ড বিমানে করে সদিচ্ছায় দেশ ছেড়েছে। এ বিষয়ে ফেসবুকে ছড়ানো অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।