সৌদি আরবের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গিয়েছিল শামীম ও সাব্বিরের শরীর। আগুনে মরদেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় দেশে আনা হয়েছে তাদের মরদেহ। প্রিয়জনের শেষবারের মতো মুখ দেখার অপেক্ষায় থাকা দুটি পরিবারে এখন চলছে দাফনের প্রস্তুতি। গ্রামে খোঁড়া হচ্ছে কবর।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে ঢাকায় পরিবারের কাছে মরদেহ দুটি হস্তান্তর করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ নিয়ে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হবেন স্বজনেরা। বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন নিহত শামীমের মা শাহিনুর বেগম। শামীম ও সাব্বিরের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায়।
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাম্মী আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নলডাঙ্গার তিনজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনের মরদেহ প্রথম দফায় দেশে আসে। দ্বিতীয় দফায় শনিবার বাকি দুজনের মরদেহ আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকায় ইতিমধ্যে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। বিকেল ৪টার দিকে নিজ নিজ গ্রামে তাদের দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। দাফনে নলডাঙ্গার সহকারী কমিশনার (ভূমি) উপস্থিত থাকবেন। শেষযাত্রার খরচ উপজেলা প্রশাসন বহন করবে।
সৌদি আরবের একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের মধ্যে তিনজন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা। এই তিনজনের মধ্যে প্রথম দফায় রবিউল ইসলামের মরদেহ দেশে আসে। বাকি দুজন শামীম ও সাব্বির।
শামীম হোসেন নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে। একই এলাকার গোলাম রাব্বানীর ছেলে সাব্বির আহমেদ (৩০)।
নিহত শামীমের মা শাহিনুর বেগম বিলাপ করতে করতে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার ব্যাডা খুব বেশি পুড়ে গেছে। চেনা যায়নি। এখন ডিএনএ টেস্ট করাইছে। বাপে (জাকির আলী) ডিএনএ দেওয়ার পর ব্যাডার লাশ আইসে।
শামীমের বাবা জাকির হোসেন বলেন, ছেলের মরদেহ ভয়াবহভাবে পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করতে সময় লেগেছে। অবশেষে ছেলের মরদেহ দেশে এসেছে। এখন বাড়িতে নেওয়া হচ্ছে। ছেলের মরদেহ দাফন করতে পারবেন, এটাই তার কাছে বড় পাওয়া।
একই কথা জানালেন সাব্বিরের বাবা গোলাম রাব্বানী। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ছেলের শরীর এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল যে আঙুলের ছাপ দিয়েও পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। ছেলের মরদেহ দাফনের জন্য গ্রামে প্রস্তুতি চলছে।
ধারদেনা করে ২০১৬ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন শামীম। ২০২১ সালে দেশে ফিরে বিয়ে করেন। পাঁচ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো সৌদি আরবে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী ছিলেন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। প্রবাসে থাকা অবস্থায় শামীমের মৃত্যুর খবর আসে। তখন তার স্ত্রী মিতু খাতুনের কোলে দুই মাসের কন্যাসন্তান ছাপা জান্নাহ।
মৃত্যুর আগের দিন সকাল ১০টার দিকে ভিডিও কলে শেষবারের মতো মেয়ের মুখ দেখেছিলেন শামীম। পরিবারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, ছোট্ট মেয়েটি কোনও দিনই বাবাকে নিজের চোখে দেখতে পারবে না।
কাঁদতে কাঁদতে শামীমের স্ত্রী মিতু খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মরদেহের অপেক্ষার যেন শেষ হচ্ছে না। মরদেহ বাড়িতে এলে অন্তত মেয়েকে নিয়ে কবরের পাশে গিয়ে দোয়া করতে পারবেন।
তিনি বলেন, প্রবাসে থাকতেই মেয়ের নাম ছাপা জান্নাহ রেখেছিলেন শামীম। মেয়ের আকিকার জন্য টাকাও পাঠিয়েছিলেন। প্রতিদিন অন্তত দুবার ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন। স্বামীর মৃত্যুতে একদিকে যেমন তিনি শোকাহত, অন্যদিকে ছোট্ট মেয়েকে কীভাবে বড় করবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। একই সঙ্গে অপেক্ষা করছেন স্বামীর মরদেহ দেশে ফেরার।
শাহিনুর বেগম ও গোলাম রাব্বানী জানান, ছেলেদের মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পর মরদেহ দেশে ফিরছে। এখন তাদের দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সাব্বিরের বাবা গোলাম রাব্বানী জানান, প্রায় সাড়ে চার বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তার ছেলে। প্রবাসে থাকার কারণে মুঠোফোনের মাধ্যমেই ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন তারা। কথা ছিল, আগামী ঈদে দেশে ফিরবেন সাব্বির। ছেলে বাড়ি ফিরলে পুত্রবধূকে ঘরে তুলে আনার কথা ছিল। কিন্তু আগুনে পুড়ে ছেলের মৃত্যুর খবরে সবকিছু থমকে গেছে।
আক্ষেপ করে গোলাম রাব্বানী বলেন, প্রথমবারের মতো বউমা বাড়িতে এসেছে। কিন্তু স্বামীকে দেখতে পেল না। এখন স্বামীর লাশের অপেক্ষা করছে। এই কষ্ট কীভাবে সইব?
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানা গেছে, পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় মরদেহগুলো দেশে আনতে সময় লেগেছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর শনিবার সকালে শামীম ও সাব্বিরের মরদেহ দেশে আনা হয়।
শনিবার সকালে তাদের মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি চলছিল। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় জমে। কবর খোঁড়ার কাজও চলছিল। নিহতদের বাবা-মায়ের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। স্বজনেরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ছেলের স্মৃতি মনে করে ঘরের বিছানায় শুয়ে বিলাপ করছিলেন মা। শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।
সৌদি আরবের ওই সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে তিনজন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রথম দফায় পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৯ জনের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। সেদিন বিকাল ৪টার দিকে তাদের মরদেহ দেশে আসে। তাদের মধ্যে নলডাঙ্গার রবিউল ইসলামের মরদেহ ছিল। অন্যদের মধ্যে সাতজন নওগাঁর আত্রাই এবং একজন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাসিন্দা।