একসঙ্গে এলো ৫ লাশ: অ্যাম্বুলেন্স থামতেই কান্নার রোল, স্বজনদের আহাজারি

সচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। পরিবারের অভাব ঘোচানোর আশায় কেউ ঋণ করেছিলেন, কেউ বন্ধক রেখেছিলেন ভিটেমাটি। স্বজনদের চোখে ছিল সুদিন ফেরার অপেক্ষা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে প্রাণ হারানোর পৌনে তিন মাস পর সাত বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরেছে। 

তাদের মধ্যে নওগাঁর পাঁচজন। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতেই স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে একে একে মরদেহগুলো নওগাঁ ও নাটোরে নিহতদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। অ্যাম্বুলেন্স থামতেই প্রিয়জনের শেষ মুখ দেখতে ছুটে আসেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। সন্ধ্যায় নিজ নিজ গ্রামে জানাজা শেষে তাদের দাফন করা হয়।

এর আগে সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে মরদেহগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে সেগুলো নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা।

গত ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। ঘটনার পর গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হয়। তবে আগুনে পুড়ে মরদেহগুলোর চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় বাকিদের পরিচয় শনাক্ত করতে জটিলতা তৈরি হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পৌনে তিন মাসের মাথায় আরও সাতজনের মরদেহ দেশে ফিরলো।

স্বজনদের আহাজারি

ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর পাঁচজন হলেন—নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী। এ ছাড়া নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দিঘীরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শামীম ও খাজুরা গ্রামের সাব্বির হোসেনের মরদেহও একই সঙ্গে দেশে আনা হয়েছে।

নিহতদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে কেউ ভিটেমাটি বন্ধক রেখেছিলেন, কেউ চড়া সুদে ঋণ করেছিলেন। কিন্তু প্রবাসে গিয়ে তাদের জীবনই থেমে গেলো। স্বজনদের হাতে ফিরেছে কফিন, আর রয়ে গেছে ঋণের বোঝা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ, আত্রাই উপজেলার মাধবপুর, সাধনগর ও মধ্যবোয়ালিয়া গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, মেঠোপথ ধরে একে একে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতেই শোকের ছায়া নেমে আসে গ্রামগুলোতে। যে পথে প্রবাসফেরত স্বজনদের হাসিমুখে ঘরে ফেরার অপেক্ষা ছিল, সেই পথ দিয়েই ফিরেছে তাদের নিথর দেহ। অ্যাম্বুলেন্স থামার সঙ্গে সঙ্গে স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।

পার-নওগাঁ এলাকার নিহত শাহিনের মা নার্গিস বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘তিন মাস আগে এনজিও থ্যাকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে ছাওয়ালটাকে বিদেশ পাঠাইছিলাম। আগুনে হামার সব শ্যাষ হয়ে গেলো। শাহিনের ছোট ছোট দুইটা ছাওয়াল, ওগুলা এখন কী খাইবে? আর এতগুলা টাকা ঋণ আমরা কীভাবে শোধ করমু?’

আত্রাইয়ের মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজের মা পারুল বিবি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলে বলতো—আম্মু, কারখানায় কাজ পেয়েছি, দুই বছর পর বাড়ি আসবো। আজ ছেলে ফিরে এলো, কিন্তু নিথর দেহে।’

নিহতদের প্রত্যেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি

ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা মাসিদুলের বৃদ্ধ বাবা মজনু সরদার বলেন, ‘ভাবছিলাম জীবনের শেষ বয়সে ছাওয়াল সুখের দিন আনবে। তা না হয়ে এই বয়সে এসে নিজের হাতে ছেলের কফিন নামাতে হলো। এই শোক সহ্যের ক্ষমতা আমার নেই।’

একই অবস্থা সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর পরিবারেও। সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন স্ত্রী পারভীন খাতুন। তিনি বলেন, ‘ঘরে দুইটা অবুঝ বাচ্চা, ঋণের এক টাকাও শোধ হয় নাই। ওদের নিয়ে এখন আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?’

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য আপাতত পরিবারপ্রতি ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিন মাস পর সরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তিন লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনা মূল্যে মরদেহগুলো নিহতদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পরিবারগুলোর প্রতি জেলা প্রশাসনের সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।