এদিকে দিনাজপুরের এই পীর হত্যার সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজতে কুড়িগ্রাম থেকে আরেক পীরকে আটক করেছে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দিনাজপুরে নিয়ে আসা হয়েছে। একইসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত পীরের খাদেমসহ আরও দুই জনকে আটক করা হয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পীরসহ দুই জনকে হত্যার ঘটনায় বুধবার (১৫ মার্চ) সকালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি গ্রাম থেকে পীর দাবি করা এসহাক আলীকে আটক করা হয়েছে। এসহাক আলী ওই গ্রামের পীর আজিম উদ্দিনের ছেলে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বুধবার দুপুরে কুড়িগ্রাম থেকে দিনাজপুরে নিয়ে আসা হয়েছে। একইসঙ্গে মঙ্গলবার রাতেই দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার দৌলা এলাকা থেকে কাদরিয়া মোহাম্মদিয়া দরবার শরীফের খাদেম সাইদুর রহমান ও সহযোগী সমর আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। এদিকে পীরসহ জোড়া খুনের ঘটনায় নিহত ফরহাদ হাসানের মেয়ে আতিয়া ফরহানা এ্যামি বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
স্থানীয় ও স্বজনেরা জানান, ২০০৬ সালের দিকে ফরহাদ হাসান চৌধুরী রাজনীতি ছেড়ে দেন। এরপর তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে কুড়িগ্রামের পীর দাবি করা এসহাক আলীর। তিনি পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানীর (রহ:) অনুসারী ছিলেন। তার সঙ্গে বেশ কিছুদিন চলাফেরার পর ২০১০ সালের দিকে বোচাগঞ্জ উপজেলার দৌলা গ্রামে কাদেরিয়া মোহাম্মদিয়া দরবার শরীফ নির্মাণ করেন ফরহাদ চৌধুরী। এর আগে থেকেই তার বেশ কিছু মুরিদ ও অনুসারী ছিল। দরবার শরীফ নির্মাণ করার পর তার মুরিদ ও অনুসারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তার সাত শতাধিক মুরিদ ও অনুসারী রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রত্যেক সোমবার ও বৃহস্পতিবার ফরহাদ চৌধুরীর দরবারে রাতভর জিকির হতো। এছাড়াও বৈশাখ মাসে বড় অনুষ্ঠান (ওরস) হতো যেখানে হাজার লোকের সমাগম ঘটতো।
জানা যায়, এই দরবার শরীফে মাঝেমধ্যেই আসতেন ‘পীর’ এসহাক আলী। তবে গত ২-৩ বছর আগে এসহাক আলীর সঙ্গে ফরহাদ চৌধুরীর মতবিরোধ দেখা দেয়। এরপর থেকে তিনি আর দরবার শরীফে আসতেন না, তবে ওই এলাকায় তার কয়েক মুরিদের বাড়িতে যাওয়া আসা করতেন। কথিত পীর ফরহাদ নিহত হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও তিনি এই গ্রামে বেড়াতে এসেছিলেন।
মুরিদ ও অনুসারীরা জানায়, এই দরবার শরীফে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকজনকে একসঙ্গে জিকির করাতেন তিনি। তার মতবাদও ছিল ভিন্ন রকমের। তার মুরিদদের মধ্যে যারা মুসলিম তারা ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন না। যারা সনাতন হিন্দু ধর্মালম্বী তারা সন্ধ্যা আরতি দেন না।
পুলিশ সুপার হামিদুল আলম জানান, ফরহাদ হাসান চৌধুরীর সঙ্গে কুড়িগ্রামের পীর দাবি করা এসহাক আলী মতবিরোধের সূত্র ধরেই এসহাক আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। একইসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বোচাগঞ্জ থেকে আরও দুই জনকে আটক করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘শুধু একটি তথ্যের ভিত্তিতেই নয়, বেশ কয়েকটি তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জোড়া খুনের ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। মতের কোনও পরিবর্তনের ফলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে আধ্যাত্মিক রাস্তায় চলাফেরা করতে পারেন। তবে রাজনীতি ছেড়ে আধ্যাত্মিক জগতে আসার পেছনে কোনও বিশেষ কারণ রয়েছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, সোমবার দিনগত রাত ৮ টার দিকে বোচাগঞ্জ উপজেলার দৌলা এলাকায় কথিত পীর ফরহাদ হাসান চৌধুরী ও তার পালিত মেয়ে রুপালী বেগম গুলি ও জবাই করে হত্যা করা হয়। পারুলের বুকে গুলির এবং শরীরের বিভিন্নস্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে চিহ্ন ছিল। ফরহাদ হোসেনের লাশ তার শোবার ঘরের বিছানায় ও পারুলের লাশ রান্নাঘরের মেঝেতে পাওয়া যায়।
ফরহাদ হোসেন চৌধুরী এক সময় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি। দিনাজপুর শহরে তার বাড়ি থাকলেও তিনি থাকতেন বোচাগঞ্জে। হঠাৎ করে ২০০৭-০৮ সাল থেকে তিনি রাজনীতি ও ব্যবসা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। ২০১০ সালে বোচাগঞ্জে কাদরিয়া মোহাম্মদিয়া দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এরপর থেকে দরবার শরীফেই বেশি সময় কাটাতেন। এক সময় তিনি নিজেকে ‘পীর’ বলে দাবি করতে শুরু করেন।
/এফএস/টিএন/
আরও পড়ুন-