দুই বছরে বদলে গেছে বিলুপ্ত ছিটমহলের জীবনচিত্র

বদলে গেছে বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষের জীবনচিত্রঘরে ঘরে জ্বলছে বিজলি বাতি, চলছে এলাকার রাস্তা পাকা করার কাজ, গড়ে উঠেছে নতুন নতুন স্কুল-কলেজ, প্রতিটি পরিবার ব্যবহার করছে স্যানিটারি ল্যাট্রিনসহ নলকূপ, দল বেঁধে শিশুরা ছুটছে স্কুলের দিকে— এমনই চিত্র এখন পঞ্চগড়ের বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে। দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনা অবসানের মাত্র দুই বছরে বদলে গেছে বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষের জীবনচিত্র।
২০১৫ সালের ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিনিময় হয় ছিটমহল। এরপর নানা প্রকল্প ও কর্মসূচি হাতে নেয়। এছাড়াও নানামুখী সুবিধা পেয়ে দারুণ খুশি বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলার পঞ্চগড় সদর, বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলার ৩৬টি বিলুপ্ত ছিটমহলে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। পঞ্চগড় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী নির্বাহী মো. মনিরুজ্জামান জানান, বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে ১০৫ দশমিক ২৫ কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণ, ১৯৩ মিটার ব্রিজ তৈরি, ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল খনন, ১১টি বাজারের শেড স্থাপন, সাতটি মসজিদ ও পাঁচটি মন্দির নির্মাণ করা হচ্ছে। চলতি বছরে প্রক্কলিত ৮২ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ছিটমহলবাসীদের চাহিদা অনুযায়ী সব কাজই করা হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে চলমান সব কার্যক্রম সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নির্মাণ করা হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানএছাড়া জেলা পরিষদ ১৬২ কোটি টাকার ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছে। শিক্ষার উন্নয়নে জেলা প্রশাসন ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাহিদা দিলেও ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সমাজসেবা অধিদফতর এক হাজার ১৬৫ জনকে বয়স্ক ভাতা, ৪৯১ জনকে বিধবা ভাতা এবং ৩২৪ জনকে প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করছে। মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের মাধ্যমে ৩৮০ জনকে মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং ৩ হাজার ২৫০ জনকে ভিজিডি কার্ড দেওয়া হয়েছে। বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর জীবনমান উন্নয়নে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় ২৫০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ করা হয়েছে এবং ৯ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকার ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর বাসস্থানের জন্য দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত কোটভাজনী ছিটমহলের বালাসুতি এলাকায় সিডিআরপি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০টি পরিবারের জন্য স্যানিটেশন ব্যবস্থসহ একটি গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করেছে। আরও  গুচ্ছগ্রাম নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রকল্প তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। সরকারি বেসরকারি অর্থায়নে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। শিশুরা এখন গর্বিত বাংলাদেশি হিসেবে নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। অবহেলিত ছিটমহলগুলো আলোকিত হয়ে উঠেছে।

নির্মিত হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নত ভবনপঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল কোটভাজনীর সাবিনা খাতুন বলেন, ‘আগে অনেক কষ্টে ছিলাম। দিনরাত অন্ধকারে ছিলাম। এখন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতের আলোয় ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারছে। এখন আমাদের কোনও কষ্ট নাই।’ 

পঞ্চগড় সদর উপজেলার গাড়াতি ছিটমহলের মফিজার রহমান কলেজের শিক্ষার্থী রুবিনা আক্তার ও শরিফুল ইসলাম জানান, ছিটমহলে স্কুল কলেজ হয়েছে, রাস্তা হয়েছে, বিদ্যুৎ আসছে আমরা নাগরিকত্ব পেয়েছি সব মিলিয়ে আমরা দারুণ খুশি। আগে অনেক কষ্টে মিথ্যে পরিচয় দিয়ে লেখাপড়া করতে হতো।

দিপ্তী রানী নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি সরকার থেকে সাইকেল পেয়েছি। আমি এখন সাইকেলে করে স্কুলে যেতে পারছি।’

বিলুপ্ত ছিটমহলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানপঞ্চগড় সদর উপজেলার গাড়াতি এলাকার আজাহার আলী বলেন, ‘আমরা এখন খুব সুখে আছি। দেশ পেয়েছি, নাগরিকত্ব পেয়েছি। সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনগত অধিকার পেয়েছি। বিদ্যুৎ, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্টসহ ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে।’

দেবীগঞ্জ উপজেলার দহলা খাগড়াবাড়ি ছিটমহলের বৃদ্ধ সমসের আলী বলেন, ‘রাস্তা-ঘাট হয়ে আমাদের অনেক উপকার হয়েছে। আমরা সরাসরি উপজেলা সদরের সঙ্গে যাতায়াত করতে পারছি। হাট-বাজার হয়েছে। পাকা রাস্তায় সাইকেল, ভ্যান-রিক্সা, অটো সবই চলছে। ছেলেমেয়েরা সহজেই স্কুল কলেজ যেতে পারছে। রোগী এবং কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে। আগে রোগী এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে অনেক কষ্ট ছিল।’

রাস্তা পাকা করার কাজ চলছেপঞ্চগড় সদর উপজেলার গাড়াতি ছিটমহলের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মফিজার রহমান ও বোদা উপজেলার শালবাড়ি ছিটমহলের চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ সরকার কথা রেখেছে। স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, বিদ্যুৎ সংযোগসহ সরকারের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আমরা পাচ্ছি। ছিটমহলবাসীদের সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা।

পঞ্চগড় সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার সাদাত সম্রাট জানান, মাত্র দুই বছরের মধ্যে বর্তমান সরকার ছিটমহলের সব সমস্যা নিরসন করেছে। বর্তমান সরকার ছিটমহলগুলোর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সরকারের সব ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক অমল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, সাবেক ছিটমহলগুলো বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখার অন্তভুক্ত হওয়ার পরপরই সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা তাদের নাগরিকত্ব প্রদান করেছি, ভোটার তালিকা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন কাজে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে, দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ছিটমহলগুলোতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। আজ সোমবার মধ্যরাতে পুষ্পাঞ্জলি ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হবে এবং আগামীকাল মঙ্গলবার জেলার বোদা উপজেলার পুটিমারী ছিটমহলে যৌথভাবে শিশুদের খেলাধুলাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে বলে বিলুপ্ত ছিটমহল নেতরা জানিয়েছেন।

/বিএল/এসএমএ/