শহীদ শংকু সমাজদার। যাদের রক্তের পথ বেয়ে সৃষ্টি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাকে করেছিল ত্বরান্বিত —সেইসব অকুতোভয় বাঙালির একজন ছিলেন রংপুরের শংকু সমাজদার। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেও তার আত্মদানের উল্লেখ আছে, কিন্তু স্বাধীনতার পর তার পরিবারে খবর কেউ কখনও রাখেনি। শংকু পাননি এই আত্মদানের কোনও স্বীকৃতিও। এ দিনকে ঘিরে থাকে না কোনও আয়োজন। ৪৭ বছর ধরে মানবেতর জীবনযাপন করা তার মা দীপালি সমাজদার আছেন তীব্র অভাব অনটনের মধ্যে। এই বয়সেও শুকনো পাতা কুড়িয়ে রান্না করতে হয় তাকে। ঘোলাটে চোখে তার প্রশ্ন করেন, ‘মরার আগে ছেলের এই আত্মদানের স্বীকৃতি দেখে যেতে পারবো তো?’
১৯৭১ সালের এ দিনে (৩ মার্চ) ছাত্র জনতার স্বাধিকার আন্দোলনের মিছিলে রংপুর নগরীর স্টেশন এলাকায় সরফরাজ খান নামে এক অবাঙালি গুলি বর্ষণ করে। এতে নিহত হন মিছিলের সামনের সারিতে থাকা ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র শংকু সমাজদার। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলনের ঢেউ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেও রংপুরের ছাত্র-জনতার স্বাধিকার আন্দোলনে প্রথম শহীদ শংকুর কথা উল্লেখ করেছেন। তারপরও দিনটি নিয়ে নেই কোনও আয়োজন। রংপুরেও কোনও সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে কোনও শোক বা স্মরণসভার আয়োজন করে না। নীরবে নিভৃতে কেটে যায় দিনটি।
শংকুর শহীদ হওয়া নিয়ে কথা হয় বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সিপিবি’র কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা তৎকালীন ছাত্রনেতা কমরেড শাহাদত হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা ১৫/২০ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী মিলে একটি মিছিল বের করি। মিছিলটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করার সময় পথচারীসহ সর্বস্তরের মানুষ দলে দলে অংশ নেয়। একপর্যায়ে মিছিলটি জনসমুদ্রে রূপ নেয়। আমরা মিছিলটি নিয়ে স্টেশন এলাকা পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। স্টেশন এলাকার কাছে বর্তমান দুর্নীতি দমন অফিসটি তখন ছিল অবাঙালি ব্যবসায়ী সরফরাজ খানের বাড়ি। ওই বাড়ি অতিক্রম করার সময় সরফরাজ নিজেই বন্দুক হাতে নিয়ে মিছিলে গুলি করেন। এতে নিহত হন ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র শংকু সমাজদার।
মিছিলে অংশ নেওয়া তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা অ্যাডভোকেট অলক সরকার জানান, সেদিনের মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ছাত্রলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম গোলাপ, আবুল মনসুর আহাম্মেদ, বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াছ আহাম্মেদ, আব্দুল আউয়াল টুকুসহ অনেকেই। শংকু নিহত হওয়ার পর রংপুরের সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে নগরে বন্দরে গ্রামে। এরই ধারাবাহিকতায় ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণে শহীদ শংকুর ত্যাগকে স্বীকৃতি জানান।
মুক্তিযুদ্ধের গবেষক লেখক ও শিক্ষক অধ্যাপক ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য বলেন, ‘রংপুরের প্রথম শহীদ শংকুর বৃদ্ধা মা তার বড় ছেলের পরিবারের কাছে আছেন। তারা মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। ছেলের আত্মত্যাগের জন্য কোনও স্বীকৃতি পাননি। এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার। শংকু শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তারই সূত্র ধরে ২৭ মার্চ রংপুরের বীর জনতা লাঠি হাতেই রংপুর ক্যান্টনমেন্ট দখলের চেষ্টা চালিয়ে ছিল। পরে পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হয় শত শত মানুষ।
সরেজমিন নগরীর কামাল কাছনা এলাকায় শহীদ শংকুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বৃদ্ধা মা দীপালি সমাজদার শুকনো পাতা দিয়ে ভাত রান্না করছেন। কথা বলতে চাইলে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘৪৭ বছরেও রাষ্ট্রীয় কোনও স্বীকৃতি পেলাম না। অর্থের অভাবে এক ছেলে ও এক মেয়েসহ নাতি-নাতনি নিয়ে চরম দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে। এভাবেই দিন চলা যায় না। মাঝে মাঝে মনে হয় আত্মহত্যা করি। নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দেই।’
প্রজন্ম ৭১-এর রংপুর জেলা সভাপতি দেবদাস ঘোষ দেবু স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও শহীদ শংকু রাষ্ট্রীয় কোনও স্বীকৃতি না পাওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শংকুর পরিবারকে সহায়তা করার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
আরও পড়ুন: বাঙালি নদীতে ড্রেজার বাসিয়ে বালু উত্তোলন, ভাঙনের মুখে বসতবাড়ি