হিলি সীমান্তে দায়িত্ব পালন করছেন নারী সৈনিকরাদিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ উপজেলার ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন নারীরা। এছাড়া হিলি স্থলবন্দরসহ সীমান্তে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন অনেক নারী। নিজ নিজ কর্মস্থলে সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করে দেশের ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন তারা।
উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদে কর্মরত রয়েছেন মোসা. শুকরিয়া পারভীন, উপজেলা কৃষি অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন মোসা.শামীমা নাজনীন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদে কর্মরত রয়েছেন মোসা. শরিফা আক্তার, উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা পদে কর্মরত রয়েছেন মোসা. রেজেনা পারভীন এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা পদে কর্মরত রয়েছেন রিতা লস্কর।
সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবি সৈনিকএছাড়াও সীমান্তে দায়িত্ব পালন করছেন বিজিবির ৯ জন নারী সৈনিক, রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব পালন করছেন ৬ জন নারী সৈনিক এবং থানায় এক এএসআইসহ ৫ জন নারী সৈনিক তাদের দায়িত্ব পালন করছেন।
সীমান্তে দায়িত্বরত নারী সৈনিক ইশমা, আসমা, চায়নাসহ অন্য নারী সৈনিকরা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, হিলি স্থলবন্দরের প্রতিদিনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তারা পালন করেন। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আমদানি রফতানিকৃত পণ্যের তথ্য রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধকরন, পাসপোর্ট যাত্রীদের তথ্য সংরক্ষণ ও তাদের লাগেজ চেক, নিরাপত্তা তল্লাশি ও সীমান্তে চৌকিতে দায়িত্ব পালন এবং ক্যাম্প দেখাশোনার কাজ করে থাকেন তারা। এছাড়াও নারী চোরাচালানীদের আটক ও তাদের তল্লাশিসহ তাদের থানায় সোপর্দ করে থাকেন তারা।
তারা আরও জানান, সীমান্তে বিজিবির সদস্য হিসেবে দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে পেরে তারা গর্বিত। এই বাহিনীতে চাকরি করার ফলে তারা নিজেদের পাশাপাশি তাদের পরিবারকেও স্বাবলম্বি করতে পেরেছে। আরও যারা নারী রয়েছে তারাও যেন দেশের সীমান্ত রক্ষায় কাজ করতে পারে এটাই তাদের আশা। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করার জন্য সক্ষম বলে মনে করেন তারা।
হিলি সীমান্তে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও কাজ করছেন দক্ষতার সঙ্গেজয়পুরহাট-২০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশেদ মোহাম্মদ আনিসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সিন্ধান্তের প্রেক্ষিতে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি বিজিবিতেও প্রায় দুই বছর হতে চললো নারী সৈনিকের অন্তর্ভুক্তি হয়েছে। নারী সৈনিকরা আমাদের বিজিবিতে তাদের সকল দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে সক্ষম। যে সমস্ত এন্ট্রিগুলো হয় সেগুলো তারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করতে সক্ষম হন।
তিনি আরও বলেন, নারী চোরাচালানীদের আটক বা তাদেরকে তল্লাশি করার ক্ষেত্রে সীমান্তে আগে একটা বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো বিজিবির। অনেক সময় অন্যান্য বাহিনী থেকে বা সাধারন মানুষকে দিয়ে তাদের চেক করা হতো। বর্তমানে বিজিবিতে নারী সৈনিক আসার পরে ওই কাজটা সহজ হয়ে গিয়েছে। তারা এই তল্লাশিতে গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রাখে। আমি মনে করি আরও অধিক সংখ্যক নারী সৈনিকের অন্তর্ভুক্তি বিজিবির কার্যক্রমকে আরও বেগবান করবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদে কর্মরত রয়েছেন মোসা. শরিফা আক্তারউপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. শরিফা আক্তার বলেন, ‘দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। আমি নিজে একজন নারী ও সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে মনে করি নারীদের সমাজের সকল ক্ষেত্রে পূর্ণ মর্যাদা থাকা উচিত। পাশাপাশি নারীদের অধিকারের জন্য পুরুষদেরও চিন্তা করতে হবে। দেখা যাচ্ছে যে অনেকে নারী চাকরি করছে কিন্তু তারা নিরাপদে তাদের কর্মস্থলে যেতে পারছেনা। আবার কর্মস্থলে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিপদের স্বীকার হচ্ছেন। এই যে সম্প্রতি টাঙ্গাইলে এক গার্মেন্টস কর্মী ধর্ষনের শিকার হয়েছে। এই ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে।’
উপজেলা কৃষি অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন মোসা.শামীমা নাজনীনউপজেলা কৃষি অফিসার মোসা. শামীমা নাজনীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারী হিসেবে এই চেয়ারে বসে কাজ করতে আমি কোন প্রতিবন্ধকতা অনুভব করিনা। বরং আমরা যখন মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সেবা দিতে যাই সেসময় একজন নারী হিসেবে তারা আমাকে সম্মান করে অত্যন্ত সহজে আমাকে প্রশ্ন করতে পারে। তাদের সমস্যার কথাগুলো আমার নিকট বলতে পারে। তবে আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে যাওয়ার পর বুঝতে পারি যে তৃনমূল পর্যায়ে নারীদের নিয়ে আরও অনেক কাজ করা দরকার। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ, শিক্ষা ব্যবস্থা, যৌতুক ব্যবস্থা, নারী নির্যাতন এসব নিয়ে এখনও প্রত্যেকটা স্তর থেকে কাজ করার দরকার আছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদে কর্মরত রয়েছেন মোসা. শুকরিয়া পারভীনহাকিমপুর (হিলি) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. শুকরিয়া পারভীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একজন নারী হিসেবে প্রশাসনে চাকরি করার ফলে আমি কোনও ধরনের বাধা অনুভব করিনা। বর্তমান সরকার নারী বান্ধব। এখানে প্রশাসনের কাজ করতে গিয়ে একজন পুরুষ যে দায়িত্বগুলো পালন করেন একজন নারীকেও সেই দায়িত্বগুলো পালন করতে হয়। আমাদের পুরো সিস্টেমটা একজন পুরুষের জন্য যতটুকু হেল্পফুল, আমার মনে হয় একজন নারীর ক্ষেত্রেও সেইরকম হেল্পফুল। আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টে ফেলে শুধুই নারী হিসেবে চিন্তা না করে যদি মানুষ হিসেবে দেখি তাহলে সমাজটা বদলে যাবে।’