বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় ও দেশ দুটির মূল ভূখণ্ডে এসব ছিটমহল একীভূত হওয়ার তৃতীয় বর্ষপূতি আজ ৩১ জুলাই মঙ্গলবার। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে ছিটমহলগুলোর অধিবাসীরা বাংলাদেশি নাগরিকের মর্যাদা লাভ করে। পঞ্চগড়ের তিন উপজেলার বিলুপ্ত ৩৬ ছিটমহলের ৪৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ নাগরিকত্ব পান।
ঐতিহাসিক এই দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে বিলুপ্ত বিভিন্ন ছিটমহলে ৩১ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিটে মোমবাতি প্রজ্বালন এবং ১ আগস্ট সকালে বিলুপ্ত পুঠিমারি ছিটমহলে আনন্দ শোভাযাত্রা, শিশুদের খেলাধুলাসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন সেখানকার বাসিন্দারা।
মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে যাওয়ার পর অনেক ছিটমহলের নামও পরিবর্তন হয়েছে। বিলুপ্ত পুটিমারি ছিটমহলের নাম এখন সিরাজুল ইসলাম নগর, গারতী ছিটমহলের নামকরণ করা হয়েছে রাজনগর।
এখন আমরা পাকা রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাই। স্কুল যাতায়াতের জন্য আমাদের সাইকেলও দেওয়া হয়েছে।
গাড়াতি ছিটমহলের মফিজার রহমান কলেজের একাদশ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহামুদা আখতার, দেলোয়ার হোসেন ও রুনা লায়লা জানান, তারা বাংলাদেশি হিসেবে সব সুবিধাই পাচ্ছে। আগে তাদের ভুয়া নাম ঠিকানা দিয়ে লেখাপড়া করতে হতো। সন্ধ্যার পর একটু আলোর জন্য কুপিবাতি আর মোমবাতিই ছিল ভরসা। এখন তাদের এলাকায় স্কুল কলেজ হয়েছে। বিদ্যুতের আলোয় তারা এখন লেখাপড়া করতে পারছে।
বোদা উপজেলার শালবাড়ি ছিটমহলের কৃষক সফিউদ্দিন জানান, সার-কীটনাশক পেতাম না। উৎপাদিত ধান-চাল, ফসল হাট-বাজারে নিয়ে যেতে পারতাম না। এখন পাকা রাস্তা হওয়ায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল করায় উৎপাদিত ফসল সহজেই হাটে-বাজারে নিয়ে যেতে পারছেন তারা।
বিলুপ্ত পুটিমারি ছিটমহলের নাগরিক শেফালি আখতার জানান, আগের কষ্টের দিন এখন নাই, তারা এখন খুব ভালো আছেন। বর্তমান সরকার তাদের জন্য অনেক উন্নয়ন কাজ করেছে। অনেক কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কাজ করে এখন জমির মালিক হয়েছেন তিনি। সেই জমিতে বাড়ি করেছেন।
এলজিইডি পঞ্চগড়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘পাকা রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির, হাট-বাজার, গ্রোথ সেন্টার, গোরস্থানসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করছে এলজিইডি। বর্তমানে বিলুপ্ত ছিটমহলের নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে প্রায় ৯৫ কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড পঞ্চগড়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ছিটমহল এলাকায় ১ হাজার ৬৫০ মিটার নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ এবং ৫ হাজার মিটার নদী খনন কাজ করা হয়েছে। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৪ কোটি ৩৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।’
গাড়াতি ছিটমহলের সাবেক চেয়ারম্যান মফিজার রহমান বলেন, ‘তিন বছরে বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নের চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়ন হয়েছে ছিটমহল এলাকায়। ছিটমহলের পাশে অনেক এলাকায় এখনও বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি। কিন্তু বিলুপ্ত ছিটমহলের ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলছে।’
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আজকের বিলুপ্ত ছিটমহল এলাকা এক সময় প্রকৃত অর্থেই অবহেলিত ছিল। সেখানকার মানুষের কোনও মর্যাদা ছিল না। এখন তারা নাগরিকত্বের মর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করছেন। সেখানে গত তিন বছরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকার অধিবাসীরা এখন থ্রিজি সেবা পাচ্ছেন। সেখানে একটি আইসিটি পার্কের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) মাধ্যমে সড়ক উন্নয়ন, ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণে প্রায় ৯০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বোদা উপজেলার বিলুপ্ত নাজিরগঞ্জ দইখাতা ছিটমহলের করতোয়া তীর রক্ষা বাধ নির্মাণে ২৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া সরকারের অন্যান্য সব বিভাগ ওই এলাকার অবহেলিত মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।’
পঞ্চগড়-২ আসনের সাংসদ অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, বাংলাদেশি ভুখণ্ডের মানুষের সঙ্গে সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সরকার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ উন্নয়নমূলক কাজ সমাপ্ত হয়েছে। রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার তো হয়েছেই, প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ছিটমহলের নাগরিকদের যেসব সমস্যা ছিল তার শতভাগ সমাধানে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’