একমাস পর বিশ্ববিদ্যালয় রবিবার খোলে হাবিপ্রতি। তবে শিক্ষার্থীরা আসলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১ জন সহকারী শিক্ষক প্রশাসনিক ভবনের সামনে বসে অবস্থান নেন। পরে দুপুর ১২ টার দিকে তাদের সাথে যোগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামের শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আড়াই শতাধিক শিক্ষকের মধ্যে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষক আন্দোলনে ছিলেন।
আন্দোলনরত শিক্ষকদের অভিযোগ, গত ১৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত ৬১ জন শিক্ষক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক বিধান চন্দ্র হালদারের কক্ষে গেলে সেখানে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এই অভিযোগে পরের দিন থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে অনশনে যান পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষকরা। তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় শতাধিক শিক্ষক ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনের জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয় ভর্তি পরীক্ষা এবং কর্মকর্তা ও শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা। এরই মধ্যে ২৯ নভেম্বর রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. সফিউল আলমকে লাঞ্ছিতের ঘটনায় দুই সহকারী শিক্ষককে সাময়িক বহিষ্কার করা হলে আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে উঠে। এমতাবস্থায় ৩ ডিসেম্বর ঢাকায় হাবিপ্রবি’র রিজেন্ট বোর্ডের এক সভায় ৪ ডিসেম্বর থেকে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়।
এক মাস বন্ধের পর বিশ্ববিদ্যালয় খুললেও ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে শিক্ষকরা আবার আন্দোলনে যোগদান করায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সেশনজটের পাশাপাশি ভবিষ্যত নিয়েও চিন্তায় পড়েছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের লেভেল-১, সেমিস্টার-১ এর শিক্ষার্থী ফেরদৌসী বলেন, ‘বাবা-মায়ের কষ্টে উপার্জিত টাকায় এখানে পড়াশোনা করছি। কিন্তু ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় ইতোমধ্যেই অনেকেই সেশনজটের মধ্যে পড়েছেন। পড়ালেখার যে গতি মন্থর হয়ে যাচ্ছে। তাই দ্রুত এই সংকটের সমাধান চাই আমরা।’
শিক্ষার্থী সফিকুল ইসলাম জানান, ‘এক মাস বন্ধের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেই পুরাতন চিত্র। শিক্ষকরা আন্দোলনে, ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ। কিন্তু এরই মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো সমাধান করতে পারতো। প্রশাসন ও শিক্ষকদের আলোচনা না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা। দ্রুত আলোচনা করে ক্লাস-পরীক্ষা চালু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।’
আন্দোলনকারী শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক ফাতিহা ফারহানা বলেন, ‘শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা, নারী শিক্ষকদের শ্লীলতাহানি করা ও বেতন বৈষম্যের দাবিতে আমাদের যৌক্তিক আন্দোলন। আন্দোলনের বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ না করে প্রশাসন উল্টো আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করার নামে খামখেয়ালি করছে। তাই বিষয়গুলোর সুষ্ঠু সমাধানের জন্য আমরা আন্দোলন করছি এবং তা অব্যাহত থাকবে।’
সহকারী শিক্ষকদের নেতৃত্বদানকারী কৃষ্ণ চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের দাবি-বেতন বৈষম্য দূর করা, সহকারী শিক্ষকদের লাঞ্ছনাকারীদের বিচার, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও প্রক্টরের বহিষ্কার এবং যে দুই জন শিক্ষককে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার। এসব দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে শিক্ষকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলবেই।’ দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে দাবি দাওয়া মেনে নেয়ার দাবি জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর যৌন নির্যাতন, শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা, শিক্ষিকাদের শ্লীলতাহানি করা এসব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আবার প্রশাসন এইসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. বলরাম রায় বলেন, ‘যদি শিক্ষকদের সঙ্গে প্রশাসন আলোচনায় বসে তাহলেই বিষয়গুলো সমাধান হয়। কিন্তু প্রশাসন এটি করছে না। যে কারণে সংকট আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরাও বিপাকে পড়ছে। প্রশাসনকে আলোচনা বসার মনোভাব আনার দাবি জানাই।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. এসএম হারুন-উর রশিদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক অপকর্ম ও অনিয়ম হচ্ছে। কিন্তু এসবের কোনও প্রতিকার করা হচ্ছে না। এসব বিষয় সমাধানের জন্য বসা হচ্ছে না। রবং প্রশাসন একতরফাভাবে একটি পক্ষের হয়ে কাজ করছে। অনৈতিকভাবে শিক্ষকদের সাময়িক বহিষ্কার করছে। শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তদন্ত প্রতিবেদন দিচ্ছে না। আলোচনায় বসার কথা বলে কালক্ষেপণ করছে। যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সংকট সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা বসার কোনও বিকল্প নাই।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. সফিউল আলম বলেন, ‘সহকারী শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে ওই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। অতি দ্রুতই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মু. আবুল কাশেম জানান, ‘সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি তা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনার বাইরে। তাই এই দাবি পূরণ করা সম্ভব না। ইতোমধ্যেই সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এরই মধ্যে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ডাকা হয়েছে। আলোচনার পর একটি সুষ্ঠু সমাধানে আসবে এবং ক্লাস-পরীক্ষা পুনরায় চালু হবে বলে আশা করছি।’