কৃষকদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব ৯০ শতাংশই স্থবির

ধান ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রাজশাহীর কৃষকরাসরকারের দেওয়া ভর্তুকিসহ বিভিন্ন সুবিধা পৌঁছে দিতে ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া হয় দেশের কৃষকদের। তবে দিনাজপুরে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫৭ জন কৃষককে ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া হলেও প্রায় ৯০ শতাংশই এখন স্থবির পড়ে আছে। চলতি বছরে জেলার কৃষকরা ধান ক্রয়ের টাকাও নিজস্ব ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে নিয়েছেন। কেউ কেউ নতুন করে ব্যাংক হিসাব খুলেছেন। ব্যাংক কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, আগের করা ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবগুলোর মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে, বাকি সব স্থবির।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় ১০ টাকার বিনিময়ে কৃষকদের ব্যাংক হিসাব রয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫৭টি। এরমধ্যে প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজারটি হিসাবই স্থবির রয়েছে। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, জেলায় কার্ডধারী কৃষক রয়েছেন ৫ লাখ ৯০ হাজার ৫১৩ জন। অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৫৬ জন কৃষক ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক হিসাবই খোলেননি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, দিনাজপুরের সদর উপজেলায় কৃষকের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব রয়েছে ১০ হাজার ৫০৪টি, বিরলে ২৮ হাজার ২০০টি, বোচাগঞ্জে ২১ হাজার ৮৮২টি, কাহারোলে ১৮ হাজার ১১১টি, বীরগঞ্জে ৩৫ হাজার ২০৩টি, হাকিমপুরে ১ হাজার ১৫৮টি, ঘোড়াঘাটে ৮ হাজারটি, বিরামপুরে ১২ হাজার ১৭৮টি, নবাবগঞ্জে ২৬ হাজার ৫৮০টি, ফুলবাড়ীতে ১৪ হাজার ২৫০টি, পার্বতীপুরে ৩৫ হাজার ৬৫১টি, চিরিরবন্দরে ২৮ হাজার ৯২০টি এবং খানসামা উপজেলায় রয়েছে ১৯ হাজার ২০টি।

দিনাজপুরে কৃষকদের সবচেয়ে বেশি ব্যাংক হিসাব রয়েছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে। উত্তর ও দক্ষিণ জোন নামে দুটি জোনে বিভক্ত হওয়া এই ব্যাংকের উত্তর জোনে কৃষকদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব রয়েছে ৪৭ হাজার ১০৭টি।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক দিনাজপুর শাখার ব্যবস্থাপক অসিত কুমার সরকার জানান, কৃষকদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবগুলোর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ হিসাবে বিভিন্ন ভর্তুকি জমা পড়ে। আর সেই হিসেবে মাত্র ১০ শতাংশ কৃষক সেসব ব্যাংক হিসাবে লেনদেন করেন। বাকি যে ৯০ শতাংশ হিসাব রয়েছে তা স্থবির হয়ে রয়েছে। তবে কৃষকরা চাইলেই নিজস্ব অর্থ রাখাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে সেসব ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করতে পারবেন। ওই হিসাবের মাধ্যমে অর্থ ঋণও নিতে পারবেন।

অগ্রণী ব্যাংক দিনাজপুর পুলহাট শাখার ব্যবস্থাপক মো. শফিকুজ্জামান বলেন, ‘আমন মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের অর্থ ওই ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমেই দেওয়া হয়েছে। আমার শাখায় কৃষকের ব্যাংক হিসাব রয়েছে প্রায় ৫ হাজার। যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ১০০ কৃষককে ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ দেওয়া হয়েছে। আর নতুনভাবে ব্যাংক হিসাব হয়েছে প্রায় ৯০০টি। তবে কৃষকরা ওইসব হিসাব অন্য কাজে ব্যবহার করছেন না। আবার অনেক কৃষক রয়েছেন, যাদের সঞ্চয়ী হিসাব রয়েছে। তারা আগের নিজস্ব হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন করছেন। তবে চাইলেই যেকোনও কৃষক এই ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সব ধরনের কাজ করতে পারেন।’

এদিকে দিনাজপুরে যেসব বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে কৃষকদের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব রয়েছে সেখানেও একই অবস্থা। ব্যাংকগুলোর নিয়ম অনুযায়ী যেকোনও হিসাব যদি এক বছর ব্যবহার না করা হয় তাহলে তাদের চিঠি দেওয়া হয়। এসব হিসাব আজীবন চালু থাকবে।

দিনাজপুর পৌরসভা রাজবাটী তামুলীপাড়া এলাকার কৃষক বিপুল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘এর আগে যে ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব ছিল তাতে কখনও ভর্তুকি আসেনি। তবে বোরো মৌসুমে ওই হিসাবের মাধ্যমে সরকারের কাছে ধান দেওয়ার অর্থ পেয়েছি। এবারে আমন মৌসুমে আবারও নতুন করে হিসাব করেছি। কারণ আগের যে ব্যাংক হিসাবটি ছিল সেটি দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় হিসাব নম্বর হারিয়ে ফেলেছি।’

সদর উপজেলার ৪নং শেখপুরা ইউনিয়নের বোলতৈড় এলাকার কৃষক সেলিম রেজা জানান, ব্যাংক হিসাব করার পর প্রায় পাঁচ বছর একবার ডিজেলের ভর্তুকির ২ হাজার টাকার মতো পেয়েছিলাম। এরপর আর কোনও ভর্তুকির টাকা পাইনি, তাই হিসাবটি ব্যবহারও করা হয় না।

দিনাজপুরে যেসব কার্ডধারী কৃষক রয়েছেন তাদের প্রায় সকলেরই ব্যাংক হিসাব রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। জেলায় মোট কার্ডধারী কৃষক রয়েছেন ৫ লাখ ৯০ হাজার ৫১৩ জন। এটি ২০১৬ সালের আপডেট তথ্য। তবে চলতি বছরে সকল কৃষকই কার্ডধারী হবেন। এজন্য কার্ড ছাপানোর কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। আর তাদের সকলেই ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব করতে বলা হবে।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ তৌহিদুল ইকবাল বলেন, ‘কৃষকরা সব ধরনের ভর্তুকি পাচ্ছেন। সারের দাম কমানো হয়েছে, তেলের দাম কমানো হয়েছে। এই হিসেবে শতভাগ কৃষকই সরকারি ভর্তুকি পাচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন প্রকল্পের প্রশিক্ষণ, সরকারি গুদামে ধান-গম দেওয়া, প্রদর্শনী, ক্ষেত পরিচর্যাসহ বিভিন্ন প্রকল্পে দেওয়া আর্থিক ভর্তুকির অর্থ তাদের হিসাবে জমা পড়ে ১০ শতাংশের মতো। যাদের কৃষক কার্ড আছে তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। তাদের প্রায় সকলেরই ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব রয়েছে। তবে শুধু আর্থিক ভর্তুকির জন্য নয়; বরং সব প্রয়োজনেই এসব হিসাবগুলো কৃষকরা ব্যবহার করতে পারেন।’