ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ১০ হত্যাকাণ্ডের বিচার পায়নি পরিবার

জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ সোমবার (৯ আগস্ট)। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে ভূমি দখলকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালীদের হাতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ১০ জন হত্যার বিচার এখনও পায়নি পরিবার। এ অবস্থায় অনেকেই আতঙ্কে এলাকা ছাড়ছেন বলে অভিযোগ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতাদের।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নের কচুয়া ডারকামারী (গাডাটোলা) গ্রামের সুরুজ মনি মার্ডি (৮৫)। স্বামী ফাগু সরেনের ছিল ১০৮ বিঘা জমি। ছিল মাঠ ভরা ফসল আর গোলা ভরা ধান। তিন ছেলে, দুই মেয়ে নিয়ে ছিল তাদের সুখের সংসার। কিন্তু সুরুজ মনির সেই সুখ বেশি দিন টিকলো না। স্বামী ফাগু সরেনের জমিতে নজর পড়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের। ফাগু সরেনের জমি দখলে নিতে গত তিন দশকে প্রভাবশালীরা একে একে ফাগু সরেন ও তার দুই ছেলে গোসাই সরেন এবং ঢুডু সরেনকে হত্যা করে। দখলে নেয় তাদের প্রায় সব জমি। স্বামী, দুই সন্তান আর সম্পদ হারিয়ে সুরুজ মনি এখন নিঃস্ব এবং নিস্তব্ধ।

সুরুজ মনি মার্ডি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জমি দখলকে কেন্দ্র করে ওরা প্রথমে আমার স্বামীকে মেরে ফেলেছে। পরে ছেলে দুইটাকেও মেরে ফেলেছে। এখন কিছু বললে আমাদেরও মেরে ফেলবে।’

ফাগু সরেনের নাতি নিহত ঢুডু সরেনের ছেলে রবি সরেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুধুমাত্র সম্পত্তি দখলের জন্য প্রভাবশালীরা ১৯৬৪ সালে দাদাকে হত্যা করে। মামলাও হয়েছিল। কিন্তু বিচার হয়নি। এখন সেই মামলা আর নেই। ২০১১ সালে চাচা গসাই সরেনকে রাতের আঁধারে কে বা কারা কুপিয়ে হত্যা করেছে তা আজও জানতে পারিনি। ২০১৪ সালের ২ আগস্ট আমার বাবাকে হত্যা করে তারা। আমার বাবা বাইসাইকেলে হাওয়া দিতে বাজারে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা চলমান। আমরা এসব হত্যার বিচার চাই।’

উত্তরবঙ্গ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ফোরামের সভাপতি শ্যামল মার্ডি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা নবাবগঞ্জ। এখানে অনেক জঙ্গল ছিল। যার কারণে আগে থেকেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এখানে বসবাস করতেন। পরবর্তী সময়ে জমি দখলের জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীরা নৃগোষ্ঠীর লোকজনকে উচ্ছেদ করেছে। কাউকে হত্যা করেছে, আবার কাউকে নির্যাতন করে এলাকাছাড়া করেছে।’

তিনি বলেন, ‘নবাবগঞ্জ উপজেলায় ফাগু সরেন, গোসাই সরেন, ও ঢুডু সরেন ছাড়াও রেশমি সরেন, সরকার টুডু, সোম হাসদা, জুলিয়াস মার্ডি, বস মার্ডি, কাংকড় বাস্কে এবং আমিন হাসদাকে হত্যা করে তাদের জমি দখলে নেয় ভূমিদস্যুরা। তাদের ভয়ে মামলা করারও সাহস পায়নি নিহতদের পরিবার। দুটি হত্যাকাণ্ডের মামলা হলেও বিচার পায়নি পরিবার। এসব হামলা-মামলার কারণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক লোকজন এলাকাছাড়া। এসব হত্যার রহস্য উদঘাটন এবং বিচার না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারে ক্ষোভ বেড়েছে। অনেকেই আতঙ্কে এলাকা ছাড়ছেন।’

কুশদহ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সায়েম সবুজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজনের যে কোনও সমস্যা সমাধানে সবসময় অগ্রাধিকার দিই। আমার কাছে যেসব আভিযোগ এসেছিল সবগুলোর সমাধান করেছি। তাদের সহযোগিতায় সবসময় পাশে থেকেছি। যে মামলাগুলো চলমান যদি দ্রুত বিচার হয় তাহলে স্বস্তি পাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন।’

নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশোক কুমার চৌহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের এসব ঘটনা অনেক আগের। এসব ঘটনায় করা মামলা আদালতে বিচারাধীন। রায় হলে দেখা যাবে তারা বিচার পেয়েছে নাকি পায়নি। তবে আমি এখানে থাকা অবস্থায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজনের যেসব অভিযোগ পেয়েছি, সুষ্ঠু সমাধান দিয়েছি।’